শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০০৮

যাপিতজীবন -০৫: : গাঁজাখুরি

ঢাকা শহরে থাইকা চোখ আর কানের ব্যায়াম বেশি হয় , চোখ আর কানের ব্যায়াম কম হওয়া দরকার , মামুন কয় । আমি কই, হ ,উচিত কথা , চোখ আর কান কি হাত-পায়ের পেশী , ব্যায়াম কইরা ফুইলা তোলন লাগব ,এদের দুইটার ব্যায়াম যত কম হয় তত ভাল । সে কয় , চোখের ব্যায়াম কম করন খুব কঠিন , চোখ হালায় এমুন ফাউল খালি ব্যায়াম কইরতে চায় , অনেক কষ্ট কইরা রাত্রে চোখ বন্ধ করন লাগে , দিনে রাস্তায় রুজ পাউডার মাখা মাইয়াগো দিকে চাইয়া রয় , কারও কথা শোনে না , এরে ব্যায়াম কম কইরতে কবা ক্যামনে ? আমি কই , হ , কানের ব্যায়ামও কিন্তু কম হয়না সারাদিনে , ইচ্ছা নাহইলেও এইটা ব্যায়াম করে । সকালে কাঊয়ার ডাকে এর ব্যায়াম শুরু , সারাদিন ক্লাসমেট-বন্ধুবান্ধবের , ক্লাসে স্যারের বগরবগর , রাত্রে কি শান্তি আছে ? চট্রগ্রাম থাইকা পাইকারী মাল নিয়া চানখারপুলমুখী অথবা চানখারপুল থাইকা মাল খালী কইরা চট্রগ্রাম অভিমুখী ট্রাকের ঘোঁঘোঁ শব্দে ঘুমের মইধ্যেও কানের ব্যায়াম হয় , আমি তো কই কানের ব্যায়ামই চোখের চাইতে বেশী ।সে কয় , ঠিক কইছ , এই দুইটার ব্যায়াম কিছুদিন বন্ধ করন দরকার । আমি কই , ঠিক কইছ । সেও আবার আমারে কয় , হ ঠিক কইছ । এভাবে আমরা দুইজনে ঠিক কইছ কইতে থাকি যদ্দিন না দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট থানার করতোয়া নদীর পাশের নদীর অববাহিকা অথবা নদীর চরে যাই , গিয়া কান আর চোখ ঠান্ডা কইরা নিয়া আসি ।

নদীর চর তো নয় যেন একটা বাগান , সে কয় । কানের ব্যায়াম কমাইতে আসছি , এত কথা কিসির ? আমি দেখি , মামুনের বাগান দেখি । এইটা ভুট্রার বাগান অথবা বাঁধাকপি-ফুলকপির বাগান অথবা সরিষার বাগান হইতে পারে অথবা ভুট্টা-বাঁধাকপি-ফুলকপি ও সরিষার সম্মিলিত বাগানও হইতে পারে । সে কয় , বহুত দিন পরে এইরম দেখলাম , সরিষা , গোটা মাঠটা কেমন হলুদ হইয়া আছে , দেখছ । আমি সরিষার মাঠের হলুদ দেখি । সে কয় , দেখছ মিয়া ঐখানে ভুট্টা গাছগুলা দেখছ , মাসখানেকের গাছ হইব বোধহয় , দূর থাইকা কেমন ঘাসের মতন দেখা যায় , দেখছ । আমি দূরের , আরো দূরের চরে অথবা নদীর অববাহিকায় ঘাসের মতন ভুট্টা অথবা ভুট্টার মত ঘাসদের দেখি । সে কয় ,চেন নাকি ,পাশের ক্ষেতের এইগুলারে চেন । আমি কই , চিনি চিনি , ফুলকপি । সে কয় ধুর মিয়া , এইগুলান বাঁধাকপি ,খিয়াল কইরা দেখ । আমি খিয়াল কইরা দেখি ,ফুলকপি অথবা বাঁধাকপির গাছ দেখি । ফুলকপি অথবা বাধকপি , ঘাস অথবা ভুট্টাগাছ , হলুদ সরিষা ক্ষেত দেখতে আমার ভাল লাগে । তারা আমারে চোখের ব্যায়াম কমাইতে দেয়না । অনেকদিন পর চোখের ব্যায়াম কইরা আমার আরাম হয় । চোখের ভাল ব্যায়াম হওয়ার পরে আমার ঠোটের ব্যায়ামের দরকার হইয়া পড়ে। আমি একটা বেনসন ধরাই । মামুন ঠোটের ব্যায়াম করে না । তাই সে মুখের ব্যায়াম শুরু করে । সে আম্রিকা নামের একটা দেশে যাইতে চায় । সে কয় , আমেরিকা গেলে চোখ নষ্ট হইতে পারে , ঐ দেশে চোখের ব্যায়াম বেশি হয় , বাস্তায় নামলে চোখ এদিক সেদিক যায় , উপরে নিচে যাইতে চায় ধইরা রাখা যায় না ,আমরা আমেরিকা গেলে চোখের ব্যায়াম কম কইরা করবনে । আমি কই , হবেনে । সে এতদিনেও বোঝেনি শহরে চোখের ব্যায়াম কইরতে আমার খারাপ লাগে না , আসসোস । সে কয় , অই মিয়া জিআরইটা তুমি দিয়া ফালাও আমি দিচ্ছি জিম্যাটটা , আমেরিকা যাইতেই হইব বুঝলা । আমি সিগারেট খাই , বেনসন না অইন্য কিছু , টেষ্ট বইলতে কিছু নাই , ড্যাম হয়া গেছে মনে হয় , ছুইড়া ফেলি , ঠোটের ব্যায়াম ভাল হয় না । এরপর সে ভাবে , অনেকক্ষন ধইরা কি জানি ভাবে ,এরপর কয় , শালা , চুর্দিভাই দেশ একটা আমেরিকা ,একবার যাই , এরে ভাল মত ব্যায়াম করাইতে হইব।






সোমবার, ৩ নভেম্বর, ২০০৮

বোয়াল

আগষ্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমি একবার মাছ ধরতে যাই । এটাকে অবশ্য মাছ ধরা না বলে মাছ দেখাও বলা যেতে পারে । আমার এক বন্ধু একবার বলেছিল জ্যোসনা রাতে করতোয়ার বোয়ালরা তীরের খুব কাছাকাছি চলে আসে । পানিতে তাকালে নাকি বোয়ালের জ্বলজ্বল করা রূপালী চোখ দেখা যায় । রূপালী চোখ নিয়ে বোয়ালরা যখন চারপাশে ঘুরে বেড়ায় তখন যে দৃশ্যের সৃষ্টি হয় তার নাকি কোন তুলনা নাই । তাই বোয়ালের এই চোখ দেখার উদ্দেশ্য নিয়েই আগষ্ট মাসের হাল্কা গরমের এক রাতে করতোয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম ।

নজুপুর হাটের পাশেই এই করতোয়া নদী । হাটসংলগ্ন নদীর তীরটা ক্রমশ ভাঙছে । দোকানীদের হয়েছে অসুবিধা। কিছুদিন পরপরই দোকান সামনে এগিয়ে নিতে হয় , নদী এগিয়ে আসে । করতোয়ার অপর তীরে দীর্ঘ চর । চরের বালিতে আখ , চীনাবাদাম আর আলুর চাষ হয় । চর থেকে ওপারের গ্রাম্য হাটটা দেখতে ভালই লাগে । হাটের রাতে তীরসংলগ্ন দোকানগুলোর হ্যাজাক আর কুপির আলো দোকানের ফাঁকা ফাঁকা করে বসানো কাঠের চিরগুলোর মধ্য দিয়ে নদীতে এসে পড়ে । মনে হয় অজস্র জোনাকী যেন সার বেঁধে নদীর পানিতে এসে লম্বা লাইন দিয়েছে । আজও হাটবার ছিল । দেখতে দেখতে হাটটা ফাঁকা হয়ে গেল সন্ধ্যার পরপরই । গ্রামের হাট,বেশী রাত জাগার অভ্যাস নেই ।। হাট থেকে ফিরে আসা শেষ নৌকার লোকগুলোও চরের মধ্যে কিছুক্ষন বসে বিড়ি-সিগারেট খেয়ে ফিরে গেল । এই বিস্তীর্ণ চরে মানুষ বলতে গেলে এখন বোধহয় শুধু আমি আর রজব সরদার।

রজব সরদারের বয়স প্রায় পয়তাল্লিশের কাছাকাছি । খাটো ,পাতলা টিঙটিঙে একজন লোক । এ বয়সে মাথার চুল কিছু পাকার কথা থাকলেও এনার চুল পাকে নি । রজবের বাড়ী এই করতোয়ার পাশেই কেবলাপুর গ্রামে । ঘরে জোয়ান ছেলেরা আছে । তারাই জমিজমা দেখাশুনা আর ক্ষেতখামারীর যাবতীয় কাজ করে । রজব সরদার মাছ ধরেন । মাছ ধরা তার পেশা নয় নেশা । যদিও রজবের কথাবার্তা শুনলেই বোঝা যায় কাজটা নিতান্তই শখের বশে হলেও বেশ মনযোগ দিয়েই পেশাদারিত্বের সাথে করেন তিনি । রজবের সাথে আমার প্রথম যখন এই অঞ্চলে এসে দেখা হয় তখন সে আমাকে বলেছিল ,
‘ বুঝলেন মাছ ধরাটা হইল গিয়া একটা বদ নিশা , মদ আর মাইয়া মানুষের চাইয়াও খারাপ নিশা , সহজে ছাড়ান যায় না । যৈবনে যে একবার মাছ ধরে বুড়া বয়সে আইসাও তারে মাছ ধরতে হয় ।‘
আমি রজবের কথা শুনে সেসময়ে হেসেছিলাম ।

অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ের রাত । সারাদিনে গরম থাকলেও রাতের বেলা দেখি চরে ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব । উত্তরবঙ্গ, এখানে শীত বেশ তাড়াতাড়িই আসে । রজব আমাকে ফুলহাতা শার্টটার নিচে গেন্জিজাতীয় কিছু একটা পরে নিতে বলেন । আমি বলি ,
‘কোন গেন্জি তো আনি নি’ ।
রাতে এরকম শীত পড়বে কে জানত ? রজব বলেন,
‘ চিন্তা কইরেন না । চালা থেকে গিলাপ(চাদর) দিয়া দিমুনে।‘

এই চরের মধ্যে রজবের চালা আছে জেনে আমি একটু আশ্চর্য হই । আরও আশ্চর্য হই চালার গঠনশৈলী দেখে । চালা ঘর বলতে যে রকম ঘর কল্পনায় চলে আসে সেরকম ঘর এটা নয় । কোন রকমে দুইজন মানুষ থাকার জন্য একটা কুঠুরিমতন জিনিস তৈরী করা হয়েছে আখের পাতা আর বাশের কঞ্চি দিয়ে । কয়েকটি কঞ্চি এক জায়গায় করে খুঁটির মত বানিয়ে উপরে আখের সরু পাতা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে । প্রথম দিন যখন রজবের সাথে এই চরে দেখা হয়েছিল তখন চালাটি চোখে পড়ে নি । আমি রজবকে বলি ,
’ কি এখানে থাকেন নাকি ?’
রজব বলেন ,
’ মাছ ধরন হইল গিয়া ধৈর্য্যের কাম । কতক্ষন আর ধৈর্য্য রাখা যায় । মাঝে মইদ্যে চালায় যাই , খানিকটা জিরায়া আসি। বাড়ী থাইকা আহনের সময় সাথে মশারী নিয়া আহি । মশার যন্ত্রনা আছে । চারপাশে টাঙায়া দেই । ইচ্ছে হইলে তাই ঘুমোনও যায় ।‘
রজব আমাকে চালার মধ্য থেকে চাদর বের করে দেন । চালার মধ্যে রজবের মাছ ধরার সামগ্রী আর কিছু শুকনা খাবারও দেখি । আমার আর তর সয় না , বলি ,
’ চলেন , মাছ ধরার আয়োজন শুরু করি ।‘

যদিও আমার উদ্দেশ্য মাছ ধরা নয় মাছ দেখা তারপরও রজবকে মাছ ধরার কথাই বলতে হয় । এই নিশুতি রাতে কেউ একজন মাছের চোখ দেখার জন্য এই চরে পড়ে আছে এটা শুনলে রজব নিশ্চয় আমাকে পাগল ভাববে । রজব অনিকক্ষন কাশেন । চরের ঠান্ডা হাওয়ায় দিনের পর দিন থেকে হয়ত কাশি লাগিয়ে ফেলেছেন । কাশি থামানোর পর বলেন ,
‘ চ্যাং দিলেও এহন কাম হইব না । মাছেরা মানুষের চাইতে রাত ভাল বোঝে , বেশী রাত না হইলে তীরের কাছে আহে না ।‘
চ্যাং শব্দটা আগে কোনদিন শুনেছি বলে আমি মনে করতে পারি না । রজবের কাছে জানতে চাই এই চ্যাংটা কি ? রজব বলেন ,
‘ চ্যাং হইল গিয়া গড়াই মাছেরই একটা জাত । তয় এরা বেশী অস্থির । বরশীতে গাঁইথা পানিতে ছাইড়া দিলে খালি লাফায় । এদের বোয়াল কামুড় দিলেই বোয়াল শ্যাষ , বরশী ঢুইকা যায় বোয়ালের মুখের মইদ্যে ।‘
রজব চালাঘর থেকে চটের একটা বস্তা এনে চরের হাল্কা ভেজা বালিতে পেড়ে দেন । আমি বসি । রজব হুকায় টান দিতে থাকেন । এই দিনেও লোকজন হুকা খায় এটা আমার জানা ছিল না । আমি তন্ময় হয়ে রজবের হুকা খাওয়া দেখি । রজব গল্প জুড়ে দেন , নিতান্ত পারিবারিক গল্প ।

রাত গভীর হয়ে গেল রজব পলিথিনের একটা প্যাকেট থেকে চ্যাং বের করা শুরু করেন । প্যাকেটের পানিতে দেখি এরা ভালভাবেই বেঁচে আছে । রজবের কথাই ঠিক , এই মাছ অতিশয় অস্থির । হাতে নেয়ার সাথে সাথে মাথা ও লেজ একসাথে প্রবলবেগে নাড়াতে শুরু করে । রজব একটা একটা করে চ্যাং বরশীতে গাঁথেন । শরীরের মাঝামাঝি বরশী গাঁথার ফলে চ্যাং আরও বেশী করে লাফাতে শুরু করে । বরশীর সূতাটার আরেক মাথা বাঁধা হয় শক্ত বাশের কঞ্চির সাথে , নদীর পাড়গুলোতে এগুলো নাকি পোতা হবে । আমি আর রজব দুজনে মিলে সবগুলো কঞ্চিগুলো কিছুদূর ফাঁক ফাঁক করে করে তীরে গেড়ে আসি ।

আমরা চালার সামনে এসে বসে পড়ি । রজব আবার বলতে শুরু করেন ,
‘ বুঝলেন তো মাছ ধরা হইল গিয়া ধৈর্য্যের কাম....... ।‘
হ্যাঁ , মাছ ধরা যে আসলেই চরম ধৈর্য্যের একটা কাজ সেই রাতে সেটা বুঝতে পারলাম হাড়ে হাড়ে । অনেকক্ষন আগে চ্যাংসমেত বরশী দেয়া হলেও সেগুলোতে কোন মাছ পড়ে না । আমি মাঝে মাঝে পানির কাছাকাছি গিয়ে টর্চ মেরে দেখি , বোয়ালের চোখ খুঁজি । রজব হয়ত মনে করেন মাছ পড়ছে না দেখে আমি অস্থির হয়ে পড়েছি । আমাকে বলেন ,
‘ ঘুরনের কাম নাই আপনের , এইহানে আইসা বসেন । বোয়াল পড়লে এমনিতে বুঝবেন , পানির মইদ্যে চ্যাংয়ের ছঠফটানি যাইব বাইড়া । বোয়াল আইসা চ্যাংরে একেকটা কামড়াইব আর চ্যাংও এদিক-ওদিক লাফাইব ।‘
হ্যাঁ , চ্যাংকে ঘায়েল করতে বোয়ালের বোধহয় ভালই সময় লাগে কারন পানিতে একসময় বেশ হুটোপুটির শব্দ শোনা যায় । নিস্তব্ধ করতোয়ার পাড়ে শব্দটা ঠিক যেন বর্শার ফলার মতই বেঁধে কানে । রজব বলেন ,
‘ চলেন একটা বুঝি পড়ল ।‘ আমি আর রজব তড়িঘড়ি করে যাই শব্দটার উৎসের কাছে ।

গিয়ে দেখি কঞ্চিটা ঠিকই চরের বালিতে গাড়া আছে , বরশীও ঠিক আছে কিন্তু বরশীতে গাঁথা মাছটা আর নেই । আমি রজবকে আমার বামে একটু দূরে পানিতে রূপালী রংয়ের একটা চোখ দেখাই ।
রজব বলেন , ‘ ওঠেন , তাড়াতাড়ি টর্চটা ফেলেন ঐদিকে ।‘
আমি আমার সাথে থাকা এক ব্যাটারীর টর্চের আলো নদীর পানিতে ফেলি । পানির মধ্যে রূপালী চোখ নিয়ে একটা বোয়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে ।
রজব অনেকক্ষন কেশে নেন তারপর বলেন , ‘এই বোয়ালটা অনেক বড় , গতবার পাইছিলাম এইরকম একটা। সচরাচর এইরকম বড় বোয়াল পাওয়া যায় না ।‘
আমি বলি ,’ কোথায় আমার কাছে তো খুব একটা বড় মনে হল না ।‘
রজব বলেন,’ আপনারা সাহেব-সুবা শহরের মানুষ , পানির উপরে থাইকা কি আর বোয়ালরে বুঝতে পারবেন।‘ এতবড় একটা বোয়াল হাতছাড়া হওয়ায় রজবের মন একটু খারাপই হওয়ার কথা কিন্তু তাকে দেখে সেরকম মনে হল না ।
তিনি বলে চললেন ,‘বুঝলেন যত বড় মাছ তত চালাক । চালাক না হইলে কি আর পানির এত শত্রুর মইদ্যে বাইড়া ওঠন সম্ভব । দেখলেন না চ্যাংটারে কেমনে খাইয়া গেছে । বরশী তো আমরা দিছিলাম চ্যাংয়ের পেটের মইদ্যে । এইটা কামুড় দিছে ল্যাজে । যাই হোক একবার যহন খাইছে তখন এইটা এহানেই থাকব । আসেন আমরা আরেকটা চ্যাং দেই ।‘
রজব আগের মতই পলিথিনের প্যাকেটটা থেকে আরেকটা চ্যাং এনে বরশীতে গেঁথে দেন । আমরা চালার সামনে গিয়ে আবার বসে পড়ি ।

খানিকক্ষণ পর আবার হুটোপুটির শব্দ শুরু হয় পানিতে । আগের জায়গাটা থেকেই শব্দটা আসছে । আমরা আবার প্রবল আগ্রহ নিয়ে কঞ্চিটার কাছে যাই ও হতাশ হই । চ্যাংটা নেই । হয়ত আগের বোয়ালটাই মাছটা খেয়ে গেছে অথবা নতুন কোন বোয়াল এসেছিল ।
রজব আমাকে বলেন , ‘ বুঝলেন আগের বোয়ালটাই চ্যাং টা খাইয়া গ্যাছে । এত জলদি জলদি আরেকটা পড়নের কথা না ।‘
রজব আরেকটা মাছ বরশীতে গেঁথে দেন এবং আগের মতই আমরা আবার চালার সামনে এসে বসি । আবার কিছুক্ষণ পর বরশীতে বোয়াল পাওয়ার শব্দ পাই কিন্তু কোন বোয়াল আর পাওয়া যায় না । রজবের এই একটা বরশীতেই আরো দুটা চ্যাং নষ্ট হয় , একটাতেও পড়ে না বোয়াল । রজব বিড়বিড় করে কি যেন বলেন । হয়ত মেজাজ খারাপ হয়েছে তার । আমার বেশ মজাই লাগে । আগেই বলেছি মাছ ধরার কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এই রাতে করোতোয়ার পাড়ে আমি আসি নি এসেছি জ্যোসনা রাতে বোয়ালের রূপালী চোখ দেখতে । সে আশা আমার প্রথমবারেই পূর্ণ হয়েছে । সে এক দৃশ্য বটে ! বন্ধুটা আমার ঠিকই বলেছিল । গোটা দুনিয়ায় এরকম সুন্দর দৃশ্য খুব একটা নেই ।

রজব বলেন ,’ বুঝলেন তো এইভাবে হইব না , পঁচা লাগব ।‘
রজব লোকটার এই এক মুদ্রাদোষ কথায় কথায় বলেন বুঝলেন । পঁচা জিনিসটা কি আমার মাথায় ঢোকে না । আমি বলি ,’ পঁচা কি’ ?
রজব বলেন , ‘ পঁচাই হইল আসল ধৈর্য্যের খেলা । আসেন আপনেরে দেখাই ।‘
রজব চালাঘর থেকে আরেকটা প্লাষ্টিকের প্যাকেট খোলেন । প্যাকেটের ভিতরে বেশ কটু গন্ধযুক্ত রোদে শুকানো পুঁটি মাছ । মাছগুলোর ভিতরের পুরো কাঁটাই বেশ দক্ষতার সাথে তুলে ফেলা হয়েছে । রজব একটা মাছ নিয়ে কাঁটার ফাঁকা জায়গাটায় একটা বরশী বিঁধে দেন । যে জায়গাটায় বোয়ালটা বারবার চ্যাং মাছগুলো খেয়ে যাচ্ছিল তার পাশেই নদীর পানিতে সামান্য দূরে বরশীটা ছুড়ে দিয়ে চরের মাটিতে বসে পড়েন ।
আমাকে বলেন , ‘ বসেন । এইবার হইল গিয়া আসল খেলা । পঁচাটা দিলাম পানির মইদ্যে , এহন বইসা থাকনের পালা । ফকফকা জোসনারা রাইত , খালি বইসা থাকবেন আর খিয়াল করবেন বরশীটার দিকে । পঁচার পুঁটিটা যখন বোয়ালে খাইব তখন বরশীর সূতাটা সইরা যাইতে থাকব একদিকে । বাস , যেইদিকে সূতাটা সইরা যাইব তার উল্টাদিকে দিবেন জোরসে একটা টান । বোয়ালের গলায় আটকাইয়া যাইব কাঁটাটা ।‘

রজবের কথায় আমি আশ্চর্য না হয়ে পারি না । এত মনযোগ দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কিভাবে পঁচার দিকে তাকিয়ে থাকা সম্ভব?
রজব আবার বলেন , ‘ এইজন্যি তো আপনেরে বারেবারে কই বড়ই ধৈর্য্যের কাম এইটা । এইযে বসছেন একবার পঁচা দিয়া , সারারাত বইসা থাকলেও যে মাছের নাগাল পাবেন তার কি কোন ঠিক আছে ?’

রজব বসে থাকেন । বসে থাকতে থাকতে পা লেগে গেলে একসময় আমাকে পঁচাটা দেন ।
‘ ধরেন , এট্টু তামুক খাইয়া আহি ।‘
আমি পঁচাটা ধরে বসে থাকি আর মাছের চোখ দেখার জন্য এদিক-ওদিক তাকাই । কিছুক্ষণ পরেই রজব আবার ফিরে এসে আবার পঁচাটা ধরেন । আমি নদীর ধারে এদিক-ওদিক হাটি , সিগারেট খাই , চালাঘরে শুয়ে থাকি । মাছ আর পঁচায় পড়ে না । দু-একবার রজবের কাছে যাই এখানেও নাকি বোয়াল টোপ খেয়ে যাচ্ছে ।
রজব বলেন , ‘ বুঝলেন বড়ই কাউটা মাছরে ভাই এইটা , ক্যামনে ক্যামনে জানি পঁচা খাইয়া যাইতাছে ।‘
আমি বলি,’ কিভাবে বুঝলেন এটা আগের বোয়ালটাই , অন্য বোয়ালও তো হতে পারে ।‘
রজব খানিকটা ক্ষেপে যান ।
‘ বিশ বছর ধইরা মাছ ধরতেছি । মাছেরে ভালই চিনি । তয় এরে ছাড়তেছি না আজকে । আপনে যান চালায় শুইয়া পড়েন ।‘

আমি চালাঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ি । মশারীর ফাঁক দিয়ে চরের হাল্কা ঠান্ডা বাতাস ভেঙে ভেঙে ঘরটার মধ্যে ঢুকে পড়ছে। ঘুমানোর জন্য আদর্শ আবহাওয়া । ঘুমানোর ইচ্ছা না থাকলেও তাই একসময় ঘুমিয়েই পড়ি ।

ঘুম ভাঙে প্রায় শেষ রাতের দিকে , রজবের গজগজানিতে ।
‘ বুঝলেন এতদিন ধইরা মাছ ধরি এইরকম চালাক মাছ আর দেখিনি । চ্যাং-পঁচা কিছুই মানতেছে না । চলেন এইবার শেষ চেষ্টাটা করি , কাটাটা মারি ।‘
চালাঘরে আমি যেখানে শুয়েছিলাম তার নিচ থেকে পাতলা লোহার তৈরী শাবল জাতীয় একটা জিনিস বের করেন রজব । জিনিসটার মাথায় শাবলের মতই তীক্ষ্ণ ফলা । এটাই নাকি কাটা । রজব পলিথিনের ব্যাগ থেকে শেষ চ্যাংটা বের করেন । আগের মতই চ্যাং টা বরশীতে গেঁথে বরশীর সূতা কঞ্চিতে বেঁধে আগের জায়গাটাতেই পুতে ফেলেন ।
রজব বলেন , ‘ বুঝলেন শ্যাষবারের খেলা এইবার । বোয়ালের চ্যাং টারে ধরার আওয়াজ পাইলেই টর্চ মারবেন ঐ জায়গায় । এরপরে আমি আছি ।‘

আমরা আবার চরের মাটিতে বসে জলের শব্দ শুনতে থাকি । অনেকক্ষণ বসে থাকার পরও যখন কোন বোয়াল আসে না তখন আমার মেজাজ সত্যিই খারাপ হতে থাকে , মাছ ধরাতো আমার কাজ নয় !
আমি রজবকে বলি,’ চলেন আজকে আর মনে হয় হবে না । ঐ বোয়ালটাই যে আসবে তার কি গ্যারান্টি ?’
রজব আমার কথার কোন জবাব দেন না । মনে হয় বিরক্ত হয়েছেন আমার ওপর । তবে মাছটার উপর তার ক্ষোভ কোন পর্যায়ে এসে পড়েছে তা বুঝতে পারি । আমি এবার রজবের সামনেই একটা সিগারেট ধরিয়ে বসে পড়ি । রজব বলেন ,’ সারারাইত তো থাকলেনই , এই শ্যাষবার একটু দেহেন ।‘

রজবের কথা মিথ্যা হয় নি । ফজরের আজানের ঠিক একটু আগে পানিতে চ্যাংয়ের লাফালাফি প্রবল হয়ে ওঠে । বোয়ালের রূপালী চোখটা আবার আমি দেখতে পাই । রজব মুখে আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে বলেন আর ইশারায় আলো ফেলতে বলেন । আমি পানিতে মাছটার উপর আলো ফেলি । আলো ফেলামাত্র রজব কাটাটা নিয়ে বিদুৎবেগে মাছটার শরীরে বিদ্ধ করার জন্য পানিতে লাফ দেন । বয়স্ক একজন লোক কিভাবে এত তাড়াতাড়ি কাটাটা সমেত পানিতে লাফিয়ে পড়ে কাটাটা মাছের গায়ে বিদ্ধ করার চেষ্টা করেন তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন । হয়ত টর্চের আলোয় মাছ দূরে সরে যেতে চায় । এত তাড়াতাড়ি না করলে চলবে কিভাবে ? রজবের শেষ চেষ্টাটা বিফলে যায় নি । বেশ বড় সাইজের কাটাবিদ্ধ একটা বোয়াল নিয়ে রজব উঠে আসেন পানি থেকে । কাটাটা দেখি বোয়ালের শরীরের ঠিক মাছখানে বিঁধেছে । থেতলে গেছে বেশ খানিকটা অংশ । রজবের মুখে বিজয়ীর হাসি ।
‘ কইছিলাম না আগের বোয়ালটাই , দেখছেন কত্ত বড় । আগের বছরে যেইটা পাইছিলাম তার চাইতে এটা বড় । বুঝলেন এইজন্যি কাটা দিয়া মাছ ধরি না , মাছের শইল বলতে কিছু থাকে না ।‘
আমি মাছটার দিকে তাকিয়ে থাকি । জলের মধ্যে জীবন্ত মাছের চোখ আর জলের বাহিরে মৃত মাছের চোখের মধ্যে কত পার্থক্য ।
রজব বলেন,’ আপনেরে কিন্তু আজকে আর সহজে ছাড়তেছি না । সকালে বাড়িত থাইকা মাছের পেটি দিয়া ভাত খাইয়া যাবেন ।‘

আমি কিছু বলি না । এরকম লড়াকু , পরাজিত আর অবশেষে মৃত বোয়ালটা দেখতে আমার কেন জানি ভাল লাগে না ।

শনিবার, ১ নভেম্বর, ২০০৮

আংটি কাহিনী

বাবা-মা ধরনের মানুষগুলো যে খুব একটা কথা রাখে না এটা বুঝতে জাবেরের খুব বেশী দিন সময় লাগে নি । এই যেমন ক্লাস সেভেনে দুইবার একই ক্লাসে থাকার বিষয়টা । অনেকেই সরকারী বৃত্তি পাওয়ার জন্য পন্চম শ্রেনীতে দুইবছর থাকে । তাকে কেন এটা সপ্তম শ্রেনীতে এসে করতে হবে তা প্রথমদিকে তার মাথাতেই ঢোকেনি । বাবাকে জাবের বরাবরই ভয় পায় । নিরূপায় হয়ে মাকেই জিজ্ঞাসা করেছিল ব্যাপারটা । মা বলেছিলেন তার বয়স নাকি কম । অল্প বয়সে স্কুলে দেয়া হয়েছে । আর একটা বছর এই ক্লাসে থাকুক কিছুটা বয়সের পরিপূর্ণতা আসবে । জাবের শুরুতে কিছুটা গাইগুই করেছিল যদিও সে জানত তাকে এই ক্লাসে আরেকবার থাকতেই হবে কারন বাবার সিদ্ধান্তের বাহিরে বাড়িতে কোন কাজ হয় না । জাবের তাই একই বই আরেকবার পড়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল । মা হয়ত জাবেরের গাইগুই করার ব্যাপারটা বাবার কানে তুলেছিলেন । বাবা তাই একদিন জাবেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন জাবের যে এই ব্যাপারটা খুব সহজেই মেনে নিয়েছে এতে তিনি খুব খুশি হয়েছেন এবং জাবেরকে কিছু একটা উপহার দিতে চান সে উপহার হিসেবে কি পেতে চায় । জাবেরের ঐ বয়সে আসলে একজোড়া চাকাওয়ালা জুতা ছাড়া আর কিছুই চাওয়ার ছিল না । এই চাকাওয়ালা জুতার নামই বা কি তা সে জানত না ।পাশের বাসার কলেজ পড়ুয়া এনাম ভাইকে সে দেখেছে কলোনির পীচঢালা রাস্তায় চাকাওয়ালা একজোড়া জুতা পড়ে সাইকেলের মত জোরে বিকেলে ঘুরে বেড়ায় । তারও এরকম একজোড়া চাকাওয়ালা জুতার খুব শখ , এনাম ভাইয়ের সাথে সে ও ঘুরে বেড়াবে , চক্কর দেবে পুরে কলোনী । বাবা শুনলে রেগে যাবেন এই ভয়ে সে কখনো কথাটা বলে নি । আজ যখন একটা সুযোগ এসেছে তখন সে বাবার কাছে এটার কথাই একবার বলে দেখল । বাবা মাথাও নেড়েছিলেন , দেবেন । জাবেরের এরকম একজোড়া জুতা পাওয়া হয়নি । তার বদলে সে যা পেয়েছে তা সে কখনোই মনে মনে আশা করে নি , একটা বিশ্রী চারকোনা জাপানি কেসিও ঘড়ি । উপহার হিসেবে ঘড়ি দেওয়ার কি আছে ? বাসার ড্রইং রুমেই তো একটা ঢাউস সাইজের দেয়াল ঘড়ি টাঙানো আছে । সময় দেখার জন্য হাতঘড়ির কি দরকার ? দেয়াল ঘড়ি থেকে দেখে নিলেই তো সে পারে । বাবা বলেছিলেন চাকাওয়ালা জুতোগুলোয় চলা নাকি খুব কঠিন , শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে । বললেই হল । জাবেরের খুব মন খারাপ হয়েছিল ।

অষ্টম শ্রেনীতে তাই বাবা যখন বললেন বৃত্তি পেলে একটা সাইকেল কিনে দেবেন জাবের তখন কথাটায় খুব একটা বিশ্বাস রাখতে পারে নি । তবুও তার মনে যে একটা ক্ষীণ আশা ছিল না তা নয় । ছাত্র হিসেবে সে খুব একটা খারাপ না হলেও অন্তত জেলা শহর থেকে বৃত্তি পাওয়ার মত একজন নয় । বৃত্তিটা পেলে সেটা তার কাছে একটা অনাকাঙ্খিত বিষয় তো হবেই বাবা মা ও নিশ্চই খুশিই হবেন । তখন একটা সামান্য সাইকেল দেওয়া তাদের জন্য এমন বিচিত্র কিছু হবে না । জাবেরর মনে এতটুকু ক্ষীণ আশা ছিলই তাই সে বছরের প্রথম থেকে পড়াশুনায় বেশ মনোযোগ দিয়েছিল ।

সে বছর জাবের সরকারী বৃত্তিটা পেয়েছিল ঠিকই কিন্তু তার আশাটা আর পূর্ণ হয় নি । সাইকেল নিয়ে প্রাইভেটে ব্যাচে যাওয়ার , এই একটু বিকেল বেলায় নদীর ধারের রাস্তাটা দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সাধটা তার অচিরেই মারা পড়ল । সাইকেল নিয়ে শহরের ব্যস্ত গাড়িঘোড়ার রাস্তায় চলতে সমস্যা হবে , পড়াশুনা কমিয়ে সারাদিন পইপই করে ঘুরবে এরকম নানান অজুহাত দেখিয়ে বাবা মা আর সাইকেলের রাস্তায় গেলেন না । সাইকেলের বদলে একটা সোনার চেইন কিনে দিলেন জাবেরকে । সোনার চেইনটা নিয়ে জাবের এক মহা সমস্যায় পড়ল । একে তো সে পুরুষমানুষ আর পুরুষমানুষের সোনাই যেখানে পরা ধর্মমতে ঠিক নয় তখন এই অল্প বয়সেই কেন তাকে এরকম একটা চেইন পড়তে দেয়া হল এটার কোন কূল-কিনারা করতে সে করতে পারল না । তারপরেও সোনার এই চেইনটা পড়তে সে রাজী ছিল , রাস্তাঘাটে সে দু-একজনকে এরকম চেইন পরে ঘুরতে দেখেছে কিন্তু বিপত্তি বাধাল চেইনের সাইজটা । চেইনটা এত বড় যে বলতে গেলে তার নাভি পর্যন্ত চলে আসে । বাবা মা দিয়েছেন কি আর করা যাবে চেইনটা সে তাই দু-চারদিন পরল । কিন্তু বন্ধুদের যন্ত্রনা যখন চরমে পৌছাল তখন মাকে চেইনটা দেওয়া ছাড়া তার আর কোন উপায় রইল না । মা ও চেইনটা কোন কথা ছাড়া নিয়ে নিলেন । কে জানে হয়ত নিজের জন্যই কিনেছিলেন ! জাবের এটাই ভাবল আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল বাবা মার কোন প্রতিশ্রূতির আশা করা যাবে না । সান্ত্বনার একটা উপলক্ষ্য অবশ্য সে কয়েকদিন পরেই পেয়েছিল । নীল পাথর বসানো সোনার একটা আংটি দেওয়া হল এবার তাকে । অফিস থেকে ফিরে কলার থোড়ের মত লাল একটা বাকসের ভিতর থেকে আংটিটা বের করেছিলেন বাবা। আংটিটা পেয়ে জাবের একটু অবাকই হল । আংটির পাথর সাধারণত হাল্কা নীল বা খয়েরী বর্ণের হয় । তারটা গাঢ় নীল বর্ণের কেন এটা সে কিছুতেই বুঝতে পারল না । অবশ্য এই আংটিটার জন্য যে তাকে সামনের জীবনে খানিকটা ঝামেলা পোহাতে হবে তা তখনও সে জানত না ।

জাবের আংটিটা অনামিকাতেই পড়েছিল । অবশ্য কেউ তাকে সে সময় বলে দেয় নি অনামিকায় আংটি পরার একটা অন্য অর্থ আছে । ছোট বলেই হয়ত কেউ বলেনি । তবে যে সময় সে প্রথম কথাটা শোনে সে সময় সবেমাত্র তার সর্বনাশ হতে শুরু হয়েছে এবং এটা থেকে পরিত্রানটা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে ।

কলেজে পড়ার সময়ই জাবের বাবাকে হারায় । পরের কয়েকটা বছর তাই সে খুব একটা সুবিধার মধ্যে পার করতে পারে না । বাবার সামান্য পেনশনের টাকায় নিজের , ছোট ভাইদের পড়াশুনা আর পরিবারকে চালিয়ে নিতে তাকে হাপিয়ে উঠতে হয়,ধরতে হয় টিউশনি । এসময় একেকটা দিন যেন একেকটা বছর মনে হতে থাকে তার কাছে । অবশ্য এ অবস্থায় তাকে বেশীদিন কাটাতে হয়নি । গ্রামের বাড়িতে নদীর মধ্যে থাকা জমিগুলো চর হয়ে জেগে ওঠাতেই যা রক্ষে । ওসব আধিয়ারদের দিয়ে যা টাকা-পয়সা পাওয়া যায় তাতে ওদের ভালই চলতে শুরু করে । ক্রান্তিকালের ঐ কয়েকটা বছরে তাকে দেখে হয়ত সবাই খানিকটা সহানুভূতিতে ভুগত , তাই হয়ত অনামিকার আংটিটার দিকে কেউ নজর কেউ কখনও দেই নি ।

অনামিকার আংটিটার দিকে যাদের নজর দেয়ার কথা ছিল তারাই অবশ্য প্রথম নজর দেয় , বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা । কিসের জন্য আংটি পরেছিস ? বিয়ে করেছিস ? এগেজড ? নাইলে কে দিল ? নানান প্রশ্ন । প্রথমদিকে অবশ্য সবাইকে সে খানিকটা সময় নিয়ে আংটির বিষয়টা বলত পরে হাল ছেড়ে দিয়েছে । হেসে বলে হ্যাঁ বিয়ে করেছি বা বিয়ে হবে হবে করছে । যদিও বিয়ে করা বা বিয়ে হবে হবে করা থেকে সে অনেকটা দূরেই ছিল সবসময় । আংটিটার জন্যই কিনা কে জানে মেয়েরা তার সাথে কখনো ভালভাবে মেশে নি !

একবার সে অবশ্য আংটিটা খোলার কথাও ভেবেছিল কিন্তু প্রায়াত বাবার শেষ স্মৃতির কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত খুলতে পারে নি । তবে অনামিকায় থাকাতেই যখন সমস্যা তখন এটাকে অনামিকা থেকে খুলে মধ্যমা বা অন্যকোন আঙুলে পরার কথাও সে একবার ভেবেছিল । শেষ পর্যন্ত এটাও হয়নি । সাত-আট বছর আগে পরা আংটি । এতদিনে তার বয়স বাড়ার সাথে সাথে আঙুলের বয়সও বেড়েছে , বেশ মোটাই হয়েছে আঙুল । অন্য আঙুলে পরা তো দূরের কথা সাবান দিয়ে ঘঁষেও অনামিকা থেকে আংটিটা খুলতে পারেনি । অবশেষে সে হাল ছেড়ে দিয়েছে , মনস্ত করেছে থাকুক অনামিকাতেই থাকুক বাবার স্মৃতিটা । বিয়ে করলে দরকার হলে বিয়ের আংটিটা অন্য আঙুলেই পরবে । আংটিটার যত্নেরও সে কোন ত্রুটি করে নি । দীর্ঘদিন ব্যবহারে আংটির গাঢ় নীল পাথরটা খনিকটা বিবর্ণ হয়ে গেলে সে এটাকে পাল্টিয়ে গাঢ় নীলের একটা পাথর বসিয়ে নিয়েছে ।

এমনিতেই আংটিটা নিয়ে জাবেরের কোন সমস্যা ছিল না , দুই একজন মজা করে বিয়েসাদি নিয়ে এটাওটা বলে তো বলুক সমস্যা নেই কিন্তু জাবেরের অন্য একটা কাজে আংটিটা বাধা হয়ে দাড়াল । বিয়ে করার জন্য জাবেরের একটা মেয়ের সাথে খনিকটা পরিচিত হওয়া বা আরও ব্যাপকভাবে বলতে গেলে প্রেম করা খুব দরকার হয়ে পড়েছিল । জাবেরের বাবা মা সেই কোন দশকের রক্ষনশীল সমাজে প্রেম করে বিয়ে করেছিল । তাই এই দশকের ছেলে হিসেবে তারও প্রেম করে বিয়ে করা বা নিদেনপক্ষে কিছুদিন জেনেশুনে একটা মেয়েকে বিয়ে করা প্রায় কর্তব্যের মধ্যে পড়ে । জাবের এটা বুঝেছে , বেশ ভালোভাবেই বুঝেছে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পর্যায়ে এসে এটাও বেশ ভালভাবেই বুঝেছে যে স্বাভাবিকভাবে যেভাবে প্রেম বা ভাবভালবাসা হয় তার এভাবে ওরকম কিছু হবে না , বিশেষত এ পর্যন্ত তার যখন কোন বান্ধবি পর্যন্ত কেউ একজন নেই ।

অগত্যা নিরূপায় তরুনের শেষ পথ হিসেবে সে ইন্টারনেটকেই বেছে নিয়েছে । আর কে না জানে এসব পথে জাবেরের মত তরুনদের জন্য মেয়েদের অভাব কখনো হয় নি । জাবেরেরও অবশ্য খুব একটা সময় লাগেনি । কিছুদিন একজনের সাথে ভাল ঘনিষ্টতার পর একজন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল আজকালের ছেলেদের মত সে কানে সোনার দুলটুল পরে কি না ? জাবের নির্দোষ জবাব দিয়েছিল সেটা সে পরে না তবে সোনা যে একেবারে পরে না তা নয় একটা আংটি পরে । মেয়েটা জানতে চেয়েছিল কোন আঙুলে সে আংটিটা পরে । জাবের হুট হাট মিথ্যা বলতে পারে না অথবা সে ভেবেছিল আঙুলের কথাটা বলুক পরে কারনটা বলবে । কিন্তু মেয়েটা অনামিকার কথাটা শোনার পর আর বেশী দেরী করে নি । জাবের অবশ্য যোগাযোগের চেষ্টা খনিকটা যে করে নি তা নয় , লাভ হয়নি । জাবের সান্ত্বনা খুঁজেছে । ক বলতে কলিকাতা শোনার অভ্যাস এ দেশের লোকজনের বহু দিনের স্বভাব , খামাখা মেয়েটাকে দোষ দিয়ে কি লাভ ? অবশ্য জাবেরের মনে ক্ষীণ একটা আশা ছিল । পাশ করার পর অফিসে-আদালতে নিশ্চই হবে , কিছু একটা হবে । কিন্তু সে সবে গিয়ে সে দেখেছে কেউ আর তাকে বিয়ের কথাই জিজ্ঞাসা করে না । হয়ত এটা একটা খুবই ব্যক্তিগত একটা প্রশ্ন , জিজ্ঞাসা করতে লোকজনের রুচিতে বাঁধে অথবা সবাই তার অনামিকাতে আংটি দেখে বুঝেছে সে বিবাহিত । কেইবা জানে এই কুফা আংটির ফল তাকে কতদিন বয়ে বেড়াতে হয় ?

রবিবার, ১০ আগস্ট, ২০০৮

যাপিত জীবন-০৪ : : একটি বিয়ে ও কুফাকাহিনী

১। বন্ধুর বোনের বিয়ে । আমাকে ফোন করে বলল আমি যেন ঠিক সাড়ে ছটায় সেগুনবাগিচাতে কমিউনিটি সেন্টারে যাই । আমি বললাম ঠিক আছে । আমি আবার কাউকে কোন সময় দিলে ঐ সময়ের আগেই চলে যাই, স্বভাবের দোষ । এবারও রওয়ানা হলাম আধঘন্টা আগে মানে ছটায় । সেগুনবাগিচাতে গেলাম , বন্ধু আমাকে যে কমিউনিটি সেন্টারের নাম বলে দিয়েছিল সেটা কষ্ট করে খুঁজেও বের করলাম । কমিউনিটি সেন্টারে দেখি অন্তত বিয়েবাড়ির কেউ নেই , কিছু লোকজন আছে টেবিল চেয়ার ঠিক করছে ঝাট-টাট দিচ্ছে এটা সেটা। আমি ভাবলাম কি ব্যাপার ভুলভাল জায়গায় চলে এসেছি নাকি । বন্ধুকে ফোন দিলাম । সে বলল একটু ঝামেলা হয়ে গেছে আর ঘন্টাখানেকের মধ্যেই নাকি সবাই আসবে । আমি ভাবলাম হৈছে , এতদিন জানতাম আমন্ত্রিত অতিথিরা আসে বিয়ে হওয়ার সময় বা বিয়ে শেষ হওয়ার পর । টুপ করে খেয়ে উপহার সামগ্রী দিয়ে কেটে পড়ে । এই প্রথম দেখলাম কেউ একজন(মানে আমি আরকি) আসছে বিয়েবাড়ীর লোকজন আসার আগে । যাক এসেই যখন পড়েছি চারপাশে একটু চক্কর দিলে কেমন হয় । কমিউনিটি সেন্টারটার পিছনে গেলাম । ওখানে দেখি কিছু লোকজন মুরগীর চামড়া ছিলছে , কেউবা আলু-টালু জাতীয় জিনসপত্র কাটছে । আমি ভাবলাম হইছে , খাওয়া আজকে হবেনে ! এই জিনিসগুলা মাত্র ছিলতেছে। এরপর রান্না হবে । সেই বান্না আবার খাব । বুঝছি রাত দশটার আগে আর খাওয়া জুটবে না কপালে । বন্ধুর উপর রাগ হল । শালা , ডাকলিই যখন এত আগে ডাকলি ক্যান, আটটার সময়ে ডাকলেও তো পারতি , এমন সময়ে ডাকছস সবার আগে এসে হাজির হইছি !

২। পকেটে আমার সাকুল্যে ছিল পাঁচশত টাকার একটা নোট আর খুচরা বিশ টাকার মত । ভাবলাম খেতে তো দশটার মত বাজবে , যাই ফাঁকে বিকেলে কিছু খেয়েও আসি আর পাঁচশত টাকার নোটটাও ভাঙ্গায়ে নিয়ে আসি , রাত্রে তো আবার বিকশাওয়ালা এখান থেকে পলাশী ত্রিশ টাকার কমে যাবে না । কমিউনিটি সেন্টারের পাশেই একটা দোকানে গেলাম । সিংগারা , সমুচা আর কফি খেয়ে তেইশ টাকা বিল হল । পাঁচশত টাকার নোটটা ধরায়ে দিলাম দোকানদারের হাতে । নোটটা দেখে দোকানদার যেন আকাশ থেকে পড়ল । ভাংতি দেই কেমনে , ভাংতি ছিল কিন্তু কয়েকজন দোকান থেকে বড় অংকের টাকা ভাঙ্গায়ে নিয়ে গেছে , বেচাবিক্রি নাই তাই ভাংতি টাকা থাকে না -- এইসব নানান আবজাব কথাবার্তা । আমি মনে মনে ভাবলাম হৈছে ভাই আপনে আমার ভাংতি টাকাগুলাই নেন , এইসব আমারে শুনায়েন না , এমনে নিজেই নানান কষ্টের মধ্যে আছি । দোকানে পকেটের সব খুচরা টাকাগুলো দিয়ে পাঁচশ টাকার নোটটা নিয়ে ফেরত আসলাম । ভাবলাম শুরু হইছে , আজকে কুফা শুরু হইছে , আরও কত কি হয় কে জানে ? না , কুফাকাহিনীর পরবর্তী অংশের জন্য বেশীক্ষন অপেক্ষা করতে হল না ।

৩। সাড়ে সাতটার দিকে লোকজন আসা শুরু করল । আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও দেখলাম দল ধরে একটা গ্রুপ আসল , অধিকাংশই চেনা । এদিক ওদিক মান্জা মেরে হাটছি এমন সময় এক জুনিয়র এসে বলল ভাইয়া আপনি একটা লুপ মিস করছেন । আমি বললাম কিসেরইবা লুপ আবার সেটা আবার মিসইবা কি ? সে বলল প্যান্টের বেল্টটা নাকি যে লুপগুলোর মধ্য দিয়ে যায় সেগুলোর একটার উপর দিয়ে গেছে , দেখতেও নাকি বাজে লাগছে খুব । বাথরুলে গিয়ে বেল্টটা ঠিক করে আনলাম । রে কুফা রে!

৪। বরমশায় আসলেন আটটার দিকে । বিয়েশাদি হয়ে খাওয়া-দাওয়া আসতে আসতে নয়টার মত বেজে গেল । প্রথম শিফটেই বসলাম । তাড়াতাড়ি খেয়ে-দেয়ে কেটে পরি । পরেরদিন আবার ল্যাবের আ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে , হাফ কাজ বাকী আছে । বন্ধুরা মিলে সবাই একসাথে বসলাম । খাবার মাত্র পবিবেশন শুরু হয়েছে এমন সময় আমাদের দাওয়াতপ্রদানকারী বন্ধুসাহেব আসলেন । দুইজন লোক নাকি আছে তাদের খুব তাড়া আছে ,এখুনি খেয়ে বিদায় নিতে হবে , জায়গা নেই । অগত্যা আমি আর একজন বন্ধু টেবিল থেকে উঠলাম । যাক আমরা না হয় একটু পরেই খাই । এদিক ওদিক হাটছি । ভাবলাম যাই এই সুযোগে পাঁচশ টাকার নোটটা খুচরা করে নিয়ে আসি ।রাস্তার দোকানপাট অধিকাংশই বন্ধ । টাকাটা খুচরা করতে আধঘন্টাখানেক লাগল । ফিরে দেখি দ্বিতীয় শিফটটা অলরেডী শুরু হয়েছে এখন তৃতীয় শিফটে বসতে হবে । তৃতীয় শিফটে খব বেশী লোক ছিল না , জনাষাটেক হবে হয়ত । এই জনাষাটেক লোক আমরা ছয়- সাতটা টেবিলে হাত-টাত ধুয়ে বসলাম । বসলাম তো বসলামই খাবার আর আসে না । মিনিট ত্রিশেক পার হয়ে গেল খাবারের কোন হদিস নাই , বন্ধু ব্যস্ত হয়ে আছে বর-কনের সাথে ভিডিওধারিত হতে । অনেকক্ষন পর তার নাগাল পাওয়া গেল । বললাম খাবার কৈ অনেকক্ষন থেকেই তো বসে আছি । সে বলল অনুমানের চেয়ে বেশী লোক দাওয়াতে এসেছে , খাবার মোটামুটি শেষ । বাকী লোকের খাবারের ব্যবস্তা নাকি হচ্ছে । বন্ধুবান্ধবরা যারা এসেছিল তারাও ইতোমধ্য বিদায় নিল । আমরা আরও কিছুক্ষন বসলাম ।অবশেষে খাবার আসা শুরু হল । হাত আবার ধুয়ে এসে টেবিলে বসলাম । কিন্তু কুফা যে আরও কিছু বাকী ছিল এটা জানতাম না । ঠিক আমাদের টেবিলটার সামনে এসে রোষ্ট-টোষ্ট , ভাজা মাংস ইত্যাকার খাদ্য শেষ হয়ে গেল । হাতধোয়াটা আবার মনে হয় বিফলে যায় ! এমন সময় দেখি বন্ধু আসছে । বললাম ধুর মিয়া এখনও তো খাবার পাইলাম না । মেজাজ তখন সহ্যক্ষমতার চূড়ায় উঠেছে । সে বলল এদিক-ওদিক দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া খাবারও নাকি শেষ । এদের একটা চায়নিজ খাবারের রেস্তোরা আছে সেই আইটেমগুলোই এখন দেওয়া হবে। প্রসেসিং চলতেছে , সামান্য একটু আর বসতে হবে । আমি ভাবলাম ওরে ভাই ! চায়নিজই যখন খাওয়াবি আমাদের দুইজনকে হাতে কিছু টাকাপয়সা ধয়ায়ে দে আমরা বাহিরে গিয়ে খেয়ে চলে যাই । খাবারের জন্য এতক্ষন বসে থাকতে ভাল লাগছে না । আরও কিছুক্ষন বসার পর বহু প্রতীক্ষার খাবার চলে এল । তৃতীয়বারের মত হাত ধুয়ে আসলাম । এবার আর কোন ভুল করলাম না আমরা , ওয়েটারের সাথে গিয়ে ওয়েটার যে টেবিলে খাবার রাখল সেখানেই জায়গা করে বসে পড়লাম । খাওয়ার সময় বন্ধুটা বলল তাড়াতাড়ি করে রান্নাবান্না করা হয়েছে জন্য নাকি রান্নাটা ভাল হয়নি বিশেষ করে মুরগীর পদটা নাকি খানিকটা অর্ধসিদ্ধই রয়েছে । আমার তখন এইসব আর শোনার সময় নাই । কাচা -টাচা যাই পাচ্ছি তাই গোগ্রাসে গিলে চলেছি ।

ঘড়িতে তখন সময় সাড়ে এগারোটা , কমিউনিটি সেন্টারটা ততক্ষনে মোটামুটিভাবে ফাঁকা হয়ে গেছে ।

শনিবার, ২ আগস্ট, ২০০৮

যাপিত জীবন -০৩ : : বুয়েটের কাহিনী

১। অ্যালগরিদম ক্লাসে স্যারের কাছে শোনা গল্প । স্যার গিয়েছেন কানাডার ওয়াটারলুতে পি,এইচ,ডি করতে । স্যারের সম্বল বলতে বাংলাদেশের শিক্ষাবোর্ড আর বুয়েট থেকে নেয়া গুটিকয় ডিগ্রী , মাথায় সর্বক্ষন পরে থাকা একটা ক্যাপ আর ইংরেজী ভাষার আধামাধা জ্ঞান । তো স্যার তার অতিপ্রিয় ক্যাপটা পরে প্রথমদিন দেখা করতে গেছেন তার পি,এইচ,ডি সুপারভাইসরের সাথে । সুপারভাইসর খুবই মাইডিয়ার টাইপের লোক । স্যারকে দেখেই বললেন what's up? . অর্থ বোঝার জন্য স্যার বাক্যটার সিনট্যাকটিক অ্যানলাইসসিস করলেন । ভাবলেন what মানেতো কি আর up মানে উপরে সুতরাং বাক্যটার অর্থ হবে উপরে কি ? তো স্যার উত্তর দিলেন it's a cap ! ( স্যারের মাথার উপরে ক্যাপই যেহেতু ছিল ! ) । কথাটা শুনে ওনার সুপারভাইসর হেসে উঠলেন । স্যারের মুখ থেকে গল্পটা শুনে আমরাও হেসে উঠলাম ।

২। থার্ড ইয়ারে কম্পাইলার ক্লাস চলছে জোরসে । এক চ্যাপ্টারের দুইশ ষাট খানা স্লাইড স্যার অনবরত পড়িয়েই যাচ্ছেন । আমি ফার্ষ্ট বেন্চে বসে খুব মনযোগী হয়ে স্লাইড দেখার আর মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক মাথা নেড়ে বুঝতে পেরেছি এমন ভান করছি ( এই স্যারের ক্লাসে এই ভানটা করতেই হয় না হলে হুট করে স্লাইড থেকে প্রশ্ন করে বিপদে ফেলে দেন ক্লাসে !) । দুর্দান্ত গতিতে ক্লাসখানা এগিয়ে চলছে এমন সময় কারেন্টটা চলে গেল । নিজের অজান্তে আমি বলে উঠলাম শিট ! না , ক্লাসটা ইন্টারাপ্টেড হল এজন্য বললাম না , বললাম কারেন্ট চলে যাওয়ায় ফ্যানগুলো বন্ধ হয়ে গরম লাগা শুরু হল এজন্য । আমি শিট মানে জানতাম ধুর , দুরো এরকম অর্থে কিন্তু স্যার কি অর্থে এটা জানতেন তা জানলাম একটু পরে । স্যার আমার পাশের জনকে ধরলেন , বললেন এই মাত্র তুমি যে কথাটা বললে এটা কি একজন শিক্ষকের সামনে ক্লাসে বলা ঠিক হল । আমার পাশেরজন আকাশ থেকে পড়ল । সে কিছুই বলেনি আর আমি যে কিছু বলেছি সেটাও সে শোনে নি । আমি তো বুঝতে পারছি স্যার কি বলতে চাচ্ছেন , ইয়া নফসি ইয়া নফসি করতে লাগলাম আমি । স্যার আমার পাশের জনের বিস্মিত মুখের দিকে চেয়ে বলতে লাগলেন আমার স্কুলে পড়া ছেলেও মাঝে মাঝে এটা বলে ,ওকে এটা বলা ছাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে । আশা করি তুমিও শিক্ষকের সামনে এ ধরনের কথা কখনও বলবে না । পাশের জন কিছু না বলে , কিছু না বুঝে আবাল হয়ে বসে থাকল । আমি ভাবলাম যাক বাঁচলাম !

ডিকশনারীতে শিট শব্দটার মানে কি ? বানান জানিনা বলে খুঁজতে পারিনি । একটা আছে sheet যেটার মানে কাগজের তা ,এটাতো স্যারের বোঝা শিট নয়ই। ক্লাসের একজন বলেছিল শিট মানে পচাঁ গু(!) । কতদূর সত্য কে জানে !

প্রাকৃত

মফা আর সাবেতের সাথে বৃদ্ধ দুইজনের দেখা হয় এক গরমের রাতে মফস্বল শহর থেকে সামান্য দূরে গ্রামের নিকটবর্তী একটি কালভার্টে ।

শীতের শেষে কেবলমাত্র গরম পড়তে শুরু করেছে । সারাদিন সূর্যের চরম চোটপাট । বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে রাস্তায় লোকজন কমতে শুরু করে । সরকারী-বেসরকারী অফিসের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা একটু বর্হিমুখী টাইপের তারা এসময় অফিস থেকে বাসায় ফিরে কাপড়-চোপড় বদলে সামান্য চা-নাস্তা খেয়ে বেড়িয়ে পড়ে । কেউ কেউ আড্ডা জমায় বইয়ের লাইব্রেরীতে , কাপড়ের দোকানে , ফার্মেসীর ভিতর ও বাহিরের টুলগুলোতে আবার কারো কারো আড্ডার স্থান হয়ে ওঠে হাটের সামনের চায়ের দোকানগুলো । গ্রামের লোকজন যারা হাট করতে এসেছিল মফস্বল শহরে তারা বাড়ীর দিকে পা বাড়ায় , কাঁচা বাজারের দোকানগুলো বন্ধ হতে শুরু করে । সারা দিন নানান কাজের পর শহরটা যেন ঝিমানোর প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে । শুধু ব্যস্ততা বাড়ে চামড়া ব্যবসায়ীদের । সারা বিকেল গরু-ছাগলের চামড়া কেনার পর এসময় এরা হিসাব নিয়ে বসে । বিশাল আড়তের কাঁচা চামড়ার কটা গন্ধের মধ্য বসে কর্মচারীরা চামড়া টান টান করে বেঁধে লবন ছিটাতে থাকে । কাল ঢাকা থেকে মহাজন এসে ট্রাক ভরে চামড়া নিয়ে যাবে । আড়তে মহা ব্যস্ততা । ঠিক এই সময়ে নিয়ম করে দুঘন্টার জন্য বিদুৎচলে যায় প্রতিদিন । সেচের মৌসুম শুরু হয়েছে । প্রত্যন্ত অন্চলে চলে গেছে বিদুৎ। স্যালো মেশিনের পানি তোলা হচ্ছে বিদুৎদিয়ে । এইসব মফস্বলে দেয়ার মত কারেন্ট কৈ ?

কারেন্ট চলে গেলে শহরটা যেন আবার সন্ধ্যার পরের ক্ষনিক নিস্তব্ধতা থেকে আবার জেগে ওঠে । প্রতিটা বাসায় হারিকেন-মোমবাতি জ্বালানো শুরু হয় । স্কুল কলেজের ছাত্ররা পড়ার টেবিল থেকে বেড়িয়ে পাড়ার মোড়ে জড়ো হয় , স্থানে স্থানে সংঘবদ্ধ হয়ে আড্ডা দেওয়া শুরু করে । যাদের বাড়িতে ছাদ আছে তাদের বাড়িতে মহিলা-মেয়েরা ছাদে জড়ো হয়ে গল্প-গুজব করে । সারা দিনেই টিভি ছাড়া এটাই এদের একমাত্র বিনোদন।

মফা আর সাবেতের এ সময়টাই ভাল লাগে । এমনিতেই সারা দিন সূর্যের তাপ শূষে নিয়ে বাড়িগুলো গরম হয়ে থাকে । কারেন্ট না গেলে বাড়িতে থাকাই সমস্যা হয়ে যেত । দুইবার করে ডিগ্রী ফেল করে এরা অনেকদিন নিজেদের বাড়িতেই বোঝা হয়ে ছিল । তখন অন্যদের গরম তো এদের উপর পড়তই । এখনও অবশ্য এদের উপর গরম পড়ে তবে সেটা বাড়ির না বাজারের । শহরের কুদ্দুস মোল্লার হাটগুলোতে এরা ইজারা তোলো । কুদ্দুস মোল্লা ঝানু ব্যবসায়ী । শহরের দুই দিন বসা হাট ছাড়াও এনার ইজারা নেয়া আছে শহরের একটু বাহিরে গ্রামের দিকের দুটা হাট । মফা আর সাবেত আরও অন্যদের সাথে এই হাটগুলোতে হাটের দিন দোকানদারদের কাছ থেকে ইজারা তোলো কুদ্দুস মোল্লার পক্ষ হয়ে । শুধু কি দোকানদার , এসব হাটের গরু-ছাগল বিক্রির চালানের টাকাও রশিদ দিয়ে তোলো গরু-ছাগলের মালিকের কাছ থেকে । গরু-ছাগলের মালিকেরা বদের একশা । আপসে গরু-ছাগল বেচে চালানের টাকা না দিয়েই সটকে পড়ার ধান্দায় থাকে । মফা আর সাবেত পালাক্রমে একজন হাটের নির্দিষ্ট জায়গায় চেয়ার টেবিল আর চালান রশিদ নিয়ে বসে থাকে আর একজন চালানের রশিদ হাতে নিয়ে অনবরত ঘোরে হাটে , কোথাও কোন দরাদরি নজরে পড়লে দূর থেকে লক্ষ্য করে । গরু-ছাগল বেচে লোকজন চালান করলে ভাল , না করে সটকে পড়ার ধান্দা করলেই গিয়ে ধরে - দে জরিমানা দুইশ টাকা ! কাচা বাজারের দোকানদাররা আবার এইদিক দিয়ে ভাল , জিনিসপাতি বেচাবিক্রির নির্দিষ্ট জায়গা আছে । প্রতিদিন এরা ঐ জায়গাতেই বসে । এদের নিয়ে মফা আর সাবেতের কোন ঝামেলা হয়না । সন্ধ্যার পর দোকান ওঠানোর আগে ইজারার টাকাটা তুললেই হল । সপ্তাহে তিন হাটের ছয় হাটবাড়ে মফা আর সাবেতের তাই প্রচন্ড ব্যস্ততা । হাটের হাজার রকমের মানুষের মাঝে মিশে ধুলা বালি আর গনগনে সূর্যের মাঝে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে এদের দিন কেটে যায় । দুপুরের আগ পর্যন্ত এরা অবশ্য ফাঁকাই । তখন কাজ বলতে কেবল প্রিতমের সেলুনে বসে ডিস্টিক্ট শহর থেকে বের হওয়া তিন টাকার নিউজপ্রিন্টের দৈনিক আজকের খবর পড়া আর আওয়ামীলীগ-বিএনপি , ইরান-আমেরিকা নিদেনপক্ষে ঘোড়াশালে নতুন পীরের পানি পড়া দিয়ে নানান ব্যায়াম নিরাময়ের ঘটনা অথবা দুলুর বাড়িতে চোরের জিনিসপত্রের সাথে ঘরে রাখা আধাখাওয়া কাঁঠাল নিয়ে যাওয়ার কথা নিয়ে এর ওর সাথে আলাপ করা ।

বাজার থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই মফা আর সাবেতের সন্ধ্যা গড়িয়ে যায় আর কারেন্টটাও যায় এসময় । এরা তখন লুঙ্গি আর টিশার্ট পরে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে হাটতে । হাটা বলতে প্রতিদিন আসলে একই রাস্তায় হাটা । বাড়ির সামনে দিয়ে গ্রামের দিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে সেটা দিয়ে পনের-বিশ মিনিট হাটলে একটা ভাঙ্গা কালভার্ট চোখে পড়ে । মফা আর সাবেত প্রতিদিন এই রাস্তাটা ধরেই হাট থেকে গ্রামের দিকে ফিরে যাওয়া হাটুরেদের সাথে হেটে যায় কালভার্টটা পর্যন্ত । এটা বলতে গেলে শহর আর গ্রামটার সঙ্গমস্থল । বাড়িঘর তেমন একটা এদিকে নেই । দুই পার্শ্বে ফসলী জমি । কালভার্টটার উত্তর দিক থেকে এ সময় হু-হু করে বাতাস আসে যেন মনে হয় এটা ভেঙ্গেই যাবে । মফা আর সাবেতের বেশ লাগে বাতাসটা । ওরা সাধারণত কালভার্টটার একপাশে যেখানে বড় করে লাল রং দিয়ে জাকির প্লাস সবুরা লেখা আছে সেখানটাতেই প্রতিদিন বসে । হাটুরে লোকজনের কথাবার্তা শুনতে শুনতে দুজনে হাল্কা-পাতলা বিষয়-আশয় নিয়ে কথাবার্তা বলে । কখনও কখনও এদিকটায় আরও লোকজন হাওয়া খেতে আসলে তাদের সাথে কথা বলে ।

আজকে দিনটায় আকাশে অল্প-স্বল্প মেঘ ছিল । হাওয়াও পাওয়া যাচ্ছিল বেশ । কালাভার্টটাতে সাকুল্যে চারটি প্রাণী । মফা আর সাবেত রং দিয়ে লেখা জায়গাটাতেই বসেছিল । কালভার্টটের অন্যপার্শ্বে ছিল দুজন বৃদ্ধ ,পরনে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেন্জী । এরা পার্শ্বের গ্রামেরই হবে বোধহয় । মফাই প্রথম কথা বলতে শুরু করে এদের সাথে ।
-চাচা খবরাখবর ভাল ।
-আর খবর জিনিসপত্রের যে দাম । মনে করেন যে আলুভর্তা আর ডাল দিয়া তিনবেলা খাবার খালেউ চলতিছে না ।
-জিনিসের দাম তো বাড়বিই ত্যালের যে দাম বাড়তিছে ।
-হামরা তো বাপু এত কিছু বুঝিনে । আগে দিন চলতিছিল ভালোই এখন আর চলতিছে না কতা এটেই ।
পাশের বৃদ্ধ বিড়বিড় করে সূরার মত কি যেন পড়ছিলেন । এবার তিনিও মুখ খোলেন ।
- আসল কতাটা হল ঈমানের পরীক্ষা চলতিছে দুনিয়াত। আল্লাতো তো কছেই দুঃখ কষ্ট দিয়ে বান্দাক পরীক্ষা করা হবি দুনিয়াত ।
-কিন্তু খিরিসটান-নাসারারাই যে সুখ করল দুনিয়াত । ওমাগের পরীক্ষা নাই ।
- ওমাগের তো দুনিয়াতি সককিছু , আখেরাত তো নাই । সুখতো করবিই ওমরা দুনিয়াত । ফলও পাবি , দুনিয়াতও পাবি এদিক-ওদিক দিয়ে আবার পরকালততো পাবিই। ক্যা তোমরা শেঙ্গলডাঙ্গার ঘটনাটা শোনেন নাই ।
-না কি হছে শেঙ্গলডাঙ্গাত । সাবেত জবাব দেয় ।
বৃদ্ধের মুখ চাঁদের আলোয় চকচক করে ওঠে । সেখানে একটা গল্প বলার আভাস পাওয়া যায় ।
- দিন দুনিয়ার খবরাখবর তোমরা থুবা না । সেদিনের ঘটানাই তো শেঙ্গলডাঙ্গার । এলাকাত তো হইহই পড়ে গেছিল । খবর পাননি তোমরা ?
মফা আর সাবেত একে অপরের দিকে তাকায় । না শেঙ্গলডাঙ্গার এরকম কোন খবর জানা নাই তাদের । মফা বলে ঘটনাটা কি চাচা কন তো দেখি শুনি ।
- শেঙ্গলডাঙ্গা এলাকাটা কবার গেলে খুব একটা কিন্তুক ভাল নয় । সারা উপজেলার মধ্যে ওটি মনে করেন যে হিন্দু-খিরিসটান বেশী । খিরিসটান মানসের গিরজা না কি করে কয় ওটাও আছে একটা । সারা বছর নানান জাগাত থেকে মানুষজন আসে , এটা সেটা লাগিই আছে । ঈমান কালামের অবস্থা কবার গেলে কিছুই নাই ঐ এলাকার মানসের ।
-তাই নাকি ? সাবেত বলে । নিজের উপজেলার মধ্যে এরকম একটা এলাকা আছে ও জানত না ভেবে অবাক হয় সাবেত ।
- তোমরা তো সেদিনের ছল-পল কি আর কবার পাবা এগোর কতা । হামরা এগোক দেকতিছি জন্ম থেকে । হামার নানিবাড়ীও আছিল শেঙ্গলডাঙ্গাত । ছোটত যায়া হামরা কত কীর্তিকলাপ দেখছি খিরিসটানের । অন্যবৃদ্ধও ঢুকে পড়ে কথার মধ্যে ।
মফা আর সাবেতের কৌতুহল আরো বাড়ে । দুজন একসাথে বলে ওঠে তারপর কি হল শেঙ্গলডাঙ্গাত ।
গল্প বড়া বৃদ্ধ কোমড় থেকে লুঙ্গির মধ্যে গুজে রাখা মেস ও বিড়ির প্যাকেট বের করে । তাজবিড়ির প্যাকেটটা থেকে একটা বিড়ি নিয়ে বাতাসের হাত রক্ষা পাওয়ার জন্য মাথা নিচু করে কৌশলে দেশলাই দিয়ে বিড়িটা ধরায় । এরপর আবার সে ঘটনাটা বলতে শুরু করে ।
- শেঙ্গলডাঙ্গার এক বড়লোক বিরাট বাড়ি বানাল । মানুষটাক হামরাও চিনতেম । সূদের কারবার আর ভেজাল ঔসধের ব্যবসা করে অনেক টেকা কামাই করছিল । মানসে ওক কত সূদে মনসূর । সেই সূদে মনসূরের বাড়িত যায়া মানসে রাড়ি দেখে হায়হায় করে । হায় হায় এত টেকা খরচা করে কেউ বাড়ি বানায় ! সূদে মনসূরও খুব খুশি । বাড়ির নাম দিল বেহেশতের বাড়ি । তোমরাই কও এটা কওয়া কি ঠিক হছিল । দুনিয়ার মানসের কি সামর্থ্য আছে বেহেশতের বাড়ি বানাবার ?
কালভার্টের চারটি লোক দুনিয়ার সামান্য লোকের এ অপার্থিব দাবিতে সমস্বরে হেসে ওঠে । কালভার্ট পার হয়ে যাওয়া হাটুরে লোকগুলোও পিছনে ফিরে দেখে কি হল । অনেকক্ষন পার হলেও তাদের হাসি থামে না । বৃদ্ধ আবার গল্প বলতে শুরু করে ।
- চারপাশের মানুষ না হয় কিছু না কবার পায়া থামে থাকল । আল্লাতো তো থামে থাকপে নায় । হলও তাই । একদিন ডিগিত থেকে একটা বান্দরের মতন কি জানি উটে আসল একটা । অনেকে কয় বান্দর অনেকে কয় বাঘ । সেটার নাকি যে সে শক্তি নয় ! সবার আগত গেল মনসূরের বাড়িত । ভায়ে দেখলে বিশ্বাস করবে নও তোমারা একেবারে চূর্নবিচূ্র্ন করে ফেলাছিল বাড়িটা । হামরা নিজে যায়া দেখে আসছি । মনে করেন যে বড় বড় গাছ যেগলা তিন পুরুষেও কাটে নি সেগলেক এক ধাক্কাত তিন চার মাইল নিয়া যায়া ফেলে দিছে । মানসের ঘরের টিনক উড়ে নিয়ে যায়া ফেলে দিছে আরেক এলাকাত । কত মানুস ঘরের টিন নিয়ে আসছে দূর-দূরান্ত থেকে । নিজের দেখা ঘটনা বাপু ,কি আর কমো । মানসের কাছে যায়া শুননো কি নাকি ত্যাজ সে বান্দরের খালি রাগোত শো-শো শব্দ করছে নাকি সে রাতোত । মানষের জান নিয়া টানাটানি । খিসটানের যে গিরজাটা আছিল ওটার তো নিশানা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি পরেরদিন । কি যে করছে ওটার । মসজিদগুলের কিন্তুক আবার কিছু হয়নি , পাকা মসজিদ আছিল তো সকগুলা । যাগের খেড়ের বাড়ি আছিল তারা তো বাড়িঘর ঊড়ে গেলে মসজিদেই আছিল । বিশ্বেস করেন নিজ চোকে দেখা , মসজিদগুলার এনা হলেও ক্ষতি হয়নি ।
- আল্লার ঘর হয় ক্ষতি হয় ক্যামনে । অনেকক্ষন পর অন্য বৃদ্ধ বলে ওঠে ।
- হ কতা তো সেট্যাই ।
- ক্যা একই রাতত পলাশগাছিতও তো একই ঘটনা ঘটছে ।
হ শুনছিলাম পলাশগাছির ঘটনা এনা এনা । ঝড়-বৃষ্টি হছিল নাকি খুব ।
-কিসের বৃষ্টি ! ক্ষেপে ওঠে গল্প বলা বৃদ্ধ । হাওয়া। হাওয়া চষে বেড়ে শ্যাষ করছে পলাশগাছি ।
হাওয়া কিসের হাওয়া ! সাবেত জানতে চায় ।
- হাওয়া বঝলে না বাপু । আমাবশ্যার আন্ধারের নাকান মিশমিশে কালো নাকিন একটা হাওয়া । তছনছ করে দিছে সককিছু । হামারহেরে এলাকার অনেকেই গেছিল দেখপার । মানসে যে পন্চাশ-একশ টেকা নিয়া গেছিল ওমাগের অবস্তা দেখে তাও দিয়ে আসছে ।
অপর বৃদ্ধও মাথা নাড়ে ।
- আল্লার খেল বুঝবার সাধ্য হামাহেরে কিইবা আছে ?
তাই দুনিয়ার মানুষ খোদার খেল কিইবা বুঝতে পারবে । মফেত ও সাবেতও সম্মতির মাথা নাড়ে ।

মফস্বল শহরটাতে কারেন্ট চলে এসেছে । ধানী জমির মধ্য দিয়ে আলোর রেখার আভাস দেখতে পায় মফা আর সাবেত । শহরের সবগুলো মসজিদ থেকে একযোগে এশার নামাজের আজান ভেসে আসে । ওদের এখন বাড়ি যেতে হবে । কারেন্ট আসার পর ওরা সাধারণত আর অপেক্ষা করে না । আজ ওদের আরেকটু থাকতে ইচ্ছা করে । বৃদ্ধদের সাথে গল্প করতে ইচ্ছা হয় আরেকটু । কিন্তু দুই বৃদ্ধ ইতিমধ্যেই বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে । থাকো বাপু হামরা গেনো নমাজ পড়া লাগবি । দুইবৃদ্ধ বাড়ির দিকে পা বাড়ায় । মফা আর সাবেতও আর বসে না ।
মফা আর সাবেত দুজনে মিলে পরদিন এর-ওর কাছে খোঁজ নেয় শেঙ্গলডাঙ্গা ও পলাশগাছী নিয়ে । হাল্কা একটা টনের্ডো হয়েছিল নাকি বছর খানেক আগে ঐ এলাকায় । মানুষের জানের তেমন ক্ষতি না হলেও মালের ক্ষতি হয়েছিল বেশ ,বিশেষ করে ঘরবাড়ি আর গাছপালার । মফা আর সাবেত এ বিষয়ে তেমন কিছু জানতে পারে নি কারন ঐ সময়টায় দুইবার ডিগ্রী ফেলের ব্যর্থতা ঢাকতে ওরা ঢাকা গিয়েছিল কাজ খুঁজতে এবং যথারীতি ব্যর্থ হয়ে একসাথে ফিরে এসেছিল তেরদিন পরে ।

মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই, ২০০৮

আমি বাংলাদেশ এখনও মরিনি - বেঁচে আছি

আমি বাংলাদেশ
আমাকে যারা তোমরা খুঁচিয়েছ,রক্তাক্ত করেছ
চোখ মেলে চেয়ে দেখ তারা আজ
এখনও আমি মরিনি
ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল অধিকার করে এখনো বেঁচে আছি
পলিসন্চন করে বাড়িয়ে তুলছি আমার অস্তিত্ব ।

আমার বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদীগুলো
একদা যাদের অস্তিস্তের সাথে মিশে থাকত নৌকা ও ইলিশ
এখন তাদের অধিকারে বিস্তীর্ণ বালুচর,কিম্ভুদরুপী বাঁধ
জেলেপাড়ার হারান মাঝি মাছ দেখেনা চোখে
বৃদ্ধ হারানের চোখে নদীগুলোর জন্য হাহাকার
মরে যাওয়া এসব প্রতিটি নদী
মৃত্যুর আগে বলে যাচ্ছে তোমরা হত্যাকারী
আমার নদীগুলোকে তোমরা হত্যা করছ
আমি বাংলাদেশ,আমাকে তোমরা হত্যা করছ।
মিলের গুদামে সারি সারি গাছের গুড়িগুলো
আসবাব ভেবে যাদের করেছ গুদামজাত
এদের বলতে দাও
এরা বলবে তোমরা হত্যাকারী
যুগ-যুগান্তরের আমার বৃক্ষেরা
আমার বুকে মাথা উচু করে দাড়ানো বৃক্ষেরা
এদেরকে তোমরা হত্যা করছ
আমি বাংলাদেশ,আমাকে তোমরা হত্যা করছ।
বায়ুতে আমার ভরছ বিষাক্ত সীসা
প্রবলভাবে শব্দাধিক্যর চর্চা করছ ডেসিবেলে
কর্ষিত জমির মধ্যে ভরে দিচ্ছ অ্যামোনিয়াম সালফেট
যেন ধমনীর মধ্যে বয়ে বেড়াচ্ছি পটাশিয়াম সায়ানেড
তবুও আমি বেচেঁ আছিএখনও না মরে বেচেঁ আছি।

আমি বাংলাদেশ বেঁচে থাকব
রক্তাক্ত,বিক্ষত আমি বেঁচে থাকব
আমার প্রতিটি শব্দ বেঁচে থাকবে যতদিন
আমার প্রতিটি বর্ণ বেঁচে থাকবে যতদিন
আটষট্টি হাজার সবুজ গ্রাম নিয়ে
মুখ থুবরে পড়ে থাকব ততদিন।

রবিবার, ২০ জুলাই, ২০০৮

যাপিতজীবন -০২ : : জমাট কলা কাহিনী

ছেলেবেলায় আমি কখনও জমাট কলা ( দুইটি কলা একসাথে থাকে ) খাই নি । আরও সহজভাবে বলতে গেলে জমাট কলা কখনও পাইনি যে খাব । আমাদের বাসায় আব্বা কখনও জমাট কলা আনতেন না । বাসায় সবাই জানত কোন পুরুষমানুষ জমাট কলা খেলে তার বৌ এর জমজ বাচ্চা হয় ! এক বাচ্চার দুনিয়ায় আসা আর তার বেড়ে ওঠা নিয়েই যত সমস্যা দুইটা বাচ্চার রিস্ক নেয় কোন বোকা ? তাই বাসায় পাওয়া এ শিক্ষাটা আমি অনেকদিন মেনে চলেছি । পরিচিত অনেক বন্ধু ও মানুষকেই পরবর্তিতে দেখেছি তারাও এ ঝুঁকি নিয়ে জমাট
কলা খান না । সুতরাং এই বিষয়টা নিয়ে কোথাও তেমন কোন বিড়ম্বনার মধ্যে আমাকে পড়তে হয়নি , মুখোমুখি হতে হয়নি বন্ধু-বান্ধবের টিটকারীরও ।

জমাট কলা না খেয়ে ,বৌয়ের ডাবল কাচ্চা-বাচ্চার ঝুঁকি এড়িয়ে দিন আমার ভালই যাচ্ছিল কিন্তু বিধাতার বুঝি আর সহ্য হল না । আঠারো বছর বয়সে যখন সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বান্ধবি( পড়ুন প্রেমিকা ) জোটানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ল তখন ঐ বয়সে আমার মধ্যে তীব্র বৈরাগ্যবোধ জন্ম নিল । এই অধমের মনে হল এই জীবন আর সংসার সব ঝুটা হ্যায় । কি লাভ এতে ? সিদ্ধান্ত নিলাম সারাটা জীবন অকৃতদারই থেকে যাব (এখন অবশ্য মাথা থেকে ভূতটা নামছে , মনে হচ্ছে বিয়াটা জরুরীই!)। বিয়েই যখন আর করছি না তাই বৌ বা কাচ্চা-বাচ্চা কিছুই আর হচ্ছে না । সুতরাং ডাবল বাচ্চার রিস্ক থাকা সত্ত্বেও জমাট কলা আমার জন্য হালাল হল । কিন্তু অন্য সকল ভাইরা যারা বিয়ে করেছিলেন বা বিয়ে করার মনস্ত করেছিলেন তাদের জন্য এই প্রজাতির কলা তখনও হারাম(!) ছিল । বলা বাহুল্য তার সুফল সেই সময় থেকে আমি পেতে শুরু করেছিলাম এবং এখনও পাচ্ছি । কিভাবে ? সেই হিসাবটাই আমি এখন বলব ।

একবার টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার পর হলে খাবার-দাবারের প্রার্দুভাব দেখা দেয় । পর্যাপ্ত ছাত্র নাই এই হেতু প্রায় সব হলের (একটি বাদে ) ক্যান্টিন বন্ধ করে দেয়া হয় । আহার গ্রহনের নিমিত্তে জৈষ্ঠ মাসের তালপাকা দুপুরে দূরবর্তী হলের ক্যান্টিনে নির্দিষ্ট সময়ে যেতে হয় । সময়ের একটু এদিক ওদিক হলেই সারা ! গিয়ে কতগুলো টেবিলে ছাত্রদের চাবানো মুরগীর হাড় ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না । সুতরাং সময় নিয়ে সবসময় তৎপর থাকি । কিন্তু বন্ধের মাসে কতই বা আর ঘড়ি ধরে চলা যায় ? দুপুরের প্রবল ঘুমের তোড়ে একবার ক্যান্টিনের টাইম মিস হয়ে যায় । অগত্যা ক্ষুধায় কাতর আমি যাই পলাশী বাজারে রুটি আর কলা কিনতে । তখন দ্রব্যমূল্যর উদ্ধগতিতে প্রতি পিস কলার দাম সবে দুই টাকা থেকে তিন টাকা হয়েছে । এমনিতেই সারা মাস বাহিরে বাহিরে খেয়ে পকেটের অবস্থা টাইট তারপরে দোকানীও দেখি বা হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির সমান কলা তিন টাকা করে চায় প্রতিটা । মেজাজ অত্যধিক খারাপ । জমাট দুইটা কলা দেখিয়ে দোকানীকে বলি আলাদা দুইটার ঝামেলা না করে ঐ দুইটাই দিন । দোকানীকে দশ টাকার একটা নোট দেই। দোকানী আমাকে সাত টাকা ফেরত দেয় । আমি লোকটার কান্ডজ্ঞান দেখে অবাক হই । এরে দিয়ে ব্যবসা হচ্ছে কিভাবে ? দোকানীকে বলি আমি তো দুইটা নিছি আপনি একটার দাম রাখছেন । দোকানীও মনে হয় আমার কান্ডজ্ঞান দেখে অবাক হয় । বলে জমজ কলার দাম একটার দামের সমান । দোকানীর ভাবটা এমন এই সাধারণ জিনিসটা আমি এতদিন জানতাম না ! আমি যুগপৎ অবাক আর আনন্দিত হই । এই চরম দুর্দিনে একটার দামে দুইটা কলা ( হোকনা জমজ) পাওয়া যাচ্ছে এটা কি কম আনন্দের ! আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ঐ দোকানেই শুধু মনে হয় এই হিসাব কিন্তু পরে অন্য দোকানেও দেখেছি একই অবস্থা । আমি সেই থেকে কলার দোকানে গেলে জমাট কলা খুঁজি । একটা কলার দামে যখন দুটি পাওয়া যাচ্ছে সেখানে আলাদা করে দুটি কিনে দোকানীকে বেশী টাকা দিয়ে কি লাভ !

সোমবার, ১৪ জুলাই, ২০০৮

যাপিতজীবন -০১ : : পরিচয় সংকট

লোকগুলোর সাথে আমাদের দেখা হয় দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার সূরা মসজিদে । তিনজন লোক , সবাই মধ্যবয়স্ক । মসজিদের সামনের বিশাল তেঁতুল গাছের নিচে বসে হয়ত বাতাস খাচ্ছিলেন তারা ।

আমরা গিয়েছি মসজিদটা দেখতে । অনেক পুরানো ঐতিহাসিক মসজিদ যেটা ঠিক কখন তৈরী হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না । স্থানীয়দের সাথে এ মসজিদটা নিয়ে একটু কথা বলতে ইচ্ছে হল আমাদের । লোকগুলোকে দেখে আমাদের ভালই লাগল যাক বেশ হল আমারাও ওনাদের সাথে তেঁতুল গাছের ছায়ায় বসে জিরিয়ে নেই আর গল্প করি । আমিই প্রথম কথা বলতে শুরু করি তাদের সাথে-আপনারা কি এই গ্রামেরই ।
-হ্যাঁ , এখানকারই ।
ঐ পাশে বাড়ী ।একটা লোক ইশারা করে সবুজ ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে ওনাদের বাড়ি দেখিয়ে দেয় আমাদের । আমি একজনের হাতে একটা নাইলনের ব্যাগ দেখি ভিতরের কি জানি কুঁ-কুঁ আওয়াজ করছে । কৌতুহল হয় ভিতরে কি আছে জানার । আমি আবার জিজ্ঞাসা করি
-ব্যাগের ভিতরে কি ?
লোকগুলোর মধ্যে একটা কেমন যেন অস্বস্থিভাব দেখতে পাই । একজন মৃদুকন্ঠে জবাব দেয়-ইঁদুর
বুঝতে বাকি থাকে না লোকগুলো সাঁওতাল আর এরা এগুলো খাওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছে । তারপরও জিজ্ঞাসা করি
-এগুলো তো খাবেন তাই না ?
লোকগুলোর মধ্য অস্বস্থিভাবটা আরো প্রকট হয়ে ওঠে যদিও আমার জিজ্ঞাসা করার মধ্যে কোন অস্বাভাবিকতা ছিল না ।
-হ্যাঁ , খাব । আমরা আদিবাসি ।
মুখ শুকনো করে বলে একজন । তাদের মুখ থেকে আমরা তাদের আসল পরিচয়টা পাই কিন্তু পুরোটা পাইনা । তারা হয়ত এটা বুঝতে শিখেছে সাঁওতাল বলার চেয়ে আদিবাসী বলাটা আমাদের মত ভদ্র পোশাক-আশাক পরা লোকের কাছে অনেকটা শোভন । আমি জিনিসটা আরেকটু নাড়াতে চাই
- সাঁওতাল তাই না ?
-হ্যাঁ ।
লোকগুলোর মুখ আরো শুকনো হয়ে ওঠে । একজন আবার বলে এখন সাঁওতাল আর অন্য সমাজের (পড়ুন হিন্দু বা মুসলমান সমাজ) মানুষের মাঝে খুব একটা পার্থক্য নেই , সবাই ক্ষেত-খামারের কাজ করছে একসাথে , আগের মত বন-জঙ্গলও নেই শিকার-টিকারও নেই । আমাদের মত ভদ্রস্থ শার্ট-প্যান্ট পড়ে আসলে নাকি আমরা তাদের চিনতেই পারব না তারা সাঁওতাল আরেকজন বলে ।

লোকগুলো তাদের গা থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাঁওতাল গন্ধ মুছে ফেলতে চায় , যত তাড়াতাড়ি পারে মিশে যেতে চায় সাধারণের মাঝে যাতে তাদের হঠাৎ করে সাঁওতাল বলে তাদের আলাদা করা না যায় । সাঁওতালদের একটা নিজস্ব কৃষ্টি আছে , কালচার আছে । কি এমন কারন যার জন্য একটি সম্প্রদায়কে তাদের পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করতে হয় , প্রজন্মকে ভুগতে হয় আত্বপরিচয় বিষয়ক সংকটে ? আমরাও কি এর বাহিরে আছি ?

রবিবার, ২৯ জুন, ২০০৮

সেইসব পাখিরা আর পাখিদের মত ঘুরে বেড়ানো মানুষেরা

অজস্র মাইল ঘুরে আসে সেইসব পাখিরা
অস্থিতে কনকনে শীতের গন্ধ ,সামান্য উষ্ণতার আশা
সাইবেরিয়ার অরন্য দু চোখে বয়ে নিয়ে
এইসব ধানের দেশে আসে সেইসব পাখিরা -
কোন শীতের সকালে বিলের পানিতে পা ডুবিয়ে উষ্ণতা খোঁজে
ঘোলে চোখে দেখে যায় মৃদু বৃষ্টির মত নেমে আসা কুয়াশার ধারা
বুকের মধ্য অনবরত বেজে যায় সুদূর সাইবেবিয়া
রাত্রের নিকষ অন্ধকারে চোখ বুজে আসলে স্বপ্ন ভেসে ওঠে
সাইবেরিয়ার স্বপ্ন , মাতৃভূমিতে ফিরে যাবার স্বপ্ন।

শীতের এইসব পাখিদের মতই যেন আমরা
উষ্ণতার খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছি এদেশ-সেদেশ
প্রশান্ত থেকে আটলান্টিক , বাল্টিক আর টেমস
অজস্র এই আমরা
ঠিক যেন পাখিদের মত -
চোখে স্বপ্ন , দেশে ফেরার স্বপ্ন ।
সেইসব পাখিদের মত আমরাও হয়ত কেউ কেউ ফিরে যাই
অথবা আমাদের কেউ কেউ পড়ে থাকি , মরার মত পড়ে থাকি
প্রবাসের ভাগাড়ে , যেমন করে যেইসব পাখিরা পড়ে থাকে
বালুচরে , শিকারীর এয়ারগানে বিদ্ধ হয়ে ।