অনেকদিন হল আমি খুন হয়ে পড়ে আছি রাস্তায় কে আমাকে হত্যা করল
বর্ষার তুমুল ঝড়ে উড়ে যাচ্ছে আমার দেহাবশেষ
যে স্বচ্ছ আকাশকে এতদিন ভালোবাসতাম
সেই আজ মেঘ হয়ে উড়িয়ে দিচ্ছে আমাকে।
খুন শুনলে তোমরা কেঁপে ওঠো
খুনি ধরা পড়ুক, বিচার হোক এই তোমাদের প্রত্যাশা
আশ্চর্য , আমি যে খুন হয়ে পড়ে আছি জানছে না কেউ,
ছাপছেনা খবরের কাগজ হইচই হচ্ছে না কোথাও
কথা হচ্ছেনা মোড়ের চায়ের টেবিলে
তবে কি মৃত আমি জীবিত আমির মতই অপাংক্তেয় ?
মানুষ থেকে কেড়ে নিল মনুষ্যত্ব কুকুর বানিয়ে ফেলে রাখল রাস্তায়
একবারও জানতে চাইল না কেউ
বর্ষার মোহন দুপুরে অপেক্ষায় থাকলাম
মর্গের ভ্যানের অপেক্ষায় থাকলাম।
রবিবার, ৬ এপ্রিল, ২০০৮
খুন হয়ে পড়ে রয়েছি রাস্তায়
শনিবার, ৫ এপ্রিল, ২০০৮
নগরপিতার কাছে আমাদের আবেদন
শ্রদ্ধেয় নগরপিতা, রুপালি পর্দায় সোনালী শরীর আইন করে খাওয়া বন্ধ করে করলেন তামাকের ধোঁয়া
এই শহরে আমরা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছি
আমরা আমাদের অপসারণ চাই ।
চারদিকে নীরব বিপ্লবের আস্ফালন আজ
পোশাকে-আশাকে, শিল্প -সংস্কৃতিতে ,রাজনীতি - বলনীতিতে
আমরা খাপ খাওয়ানোরও অযোগ্য বড়ই।
ছোট পর্দায় চল্লিশোর্ধ মহিলার যৌবন
রিকশারোহী তরুণ- তরুণীর চুম্বন
তরুণ কবির খাদ্য গাজাঁ
আর্ট ফিল্মের কামজ শরীর
ক্রমাগত শরীরের সাথে সেটে যাওয়া পোষাক
প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবিদের বক্তৃতা বিক্রি করে কেনা খাবার
আমরা আর সইতে পারছি না নগরপিতা।
অথচ শহরময় ধোঁয়ার গতি হল না কোন।
নগরপিতা আমরা পরাজিত
নব্য যাজকেরা নষ্ট করেছে আমাদের ধর্ম
সাধের সমাজতন্ত্র- সেটাও পরাজিত কম্যূনিষ্টদের কাছে
সত্যিই খাপ খাওয়াতে পারছি না আর
আমরা আমাদের অপসারণ চাই।
শুক্রবার, ৪ এপ্রিল, ২০০৮
সবুজ খাম
প্রতিদিন সকালের রোদ মুখে আসার পর আমার ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস। কিন্তু আজই প্রথম এর ব্যতিক্রম হয়ে গেল। আর মাত্র মাস খানেক পরই আমার ফোর্থ ইয়ার অনার্স ফাইনাল। সারাবছর বলতে গেলে কোন পড়াশোনাই হয় না। তাই পরীক্ষার আগের এই একমাসই ভরসা। কয়েক দিন যাবত অনেক রাত জেগে পড়তে হচ্ছে। সকালের দিকে এমন ঘুম আসল যে যখন বিছানা থেকে উঠলাম তখন বারোটা পেরিয়ে গেছে। সকালের ক্লাসটা মিস হয়ে গেল। অবশ্য ক্লাস করে যে খুব একটা লাভ হয় তা নয়। পরীক্ষার আগে গুটিকয়েক প্রথাগত প্রশ্ন পড়েই যদি বেশ চলে যায়, ক্লাস করেই তবে কী লাভ। তবুও আমি যে নিয়মিত ক্লাসে যাই সেটার জন্য একটা কারণ আছে। সেটা না হয় একটু পড়ে বলা যাবে।
হলের সরু প্যাসেজ দিয়ে বাথরুমের দিকে যাচ্ছি। পাশের রুমের জালাল জিজ্ঞেস করল, মামু কি খবর, গল্পটা পড়ছ তো? নুরুর নাস্তা এসে পড়েছে। নাস্তা বলতে একটা পেটকাটা রুটির ভেতরে ডিমপোচ। শুনলে হয়তো অনেকে বিশ্বাস করতে চাইবে না যে আমি এই একই নাস্তা গত চার বছর ধরে সকাল থেকে খেয়ে আসছি। ব্যাপারটা এতটাই একঘেয়ে হয়ে এসেছে যে এই একঘেয়েমোটাকে আর একঘেয়েমো বলে মনে হতে চায় না। শহীদুল্লাহ হলের ছাত্রদল সভাপতি সেলিম এসে আমার পাশে বসল। রাজনীতি বিষয়ক ব্যাপারগুলোতে আমি মোটামুটি নিরপেক্ষ থাকার ভান করি এবং চেষ্টা করে যাই যাতে সব নেতার মত জুগিয়ে চলা যায়। সেলিম হলের ছিটের ব্যাপারে কি যেন সব জটিল হিসাব বোঝাতে চাইল তার আগাগোড়া কিছুই বোঝা গেল না। তবে যেটুকু বোঝা গেল তাতে এটা স্পস্ট হওয়া গেল যে, আগামী বছর থেকে যাতে বিরোধী কোন দলের ভর্তিকৃত নতুন ছাত্র হলের ছিটে ঢুকতে না পারে সে ব্যাপারে তারা দেখবে। সেলিমকে এক কাপ চা খাইয়ে আমাকে নিস্তার পেতে হলো। দুপুর আড়াইটায় শহীদুল্লাহ হলের গেট পেরিয়ে বিজ্ঞান ভবনের দিকে রওয়ানা হলাম। নিম্মির টয়োটা করলাটাও এসে পড়েছে। গেটের সামনে বিশ্বজিৎ দাঁড়িয়ে আমড়া খাচ্ছে। আমাকে দেখে আমড়ার দুটো ফাল এগিয়ে দিল। শালীর বেসটা দেখছস, জোশ - একটা লোভী ভঙ্গিতে কথাটা বলল বিশ্বজিৎ। এই বেসটা জিনিসটা যে কি সেটা আমি বেশ ভালভাবেই বুঝি, অন্য সময় হলে হয়ত এরসাথে আমিও দু’একটা জিনিস যোগ করতাম, কিন্তু নিম্মির টয়োটা করোলার ড্রাইভারকে দেখে নিবৃত্ত হলাম। নিম্মির সাথে আমার পরিচয় হবার ঘটনা যতটা স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল ততটা স্বাভাবিকভাবে হয়নি। মফস্বলের একটা কলেজ থেকে পাশ করে সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল পরিবেশে এসেছি। প্রথম দিনে বিজ্ঞান ভবন খুঁজতে এসে অন্য বিল্ডিং-এ ঢুকে পড়লাম। এদিক-ওদিক ক্লাসরুম খুঁজছি, এমন সময় একটা মেয়ে এসে বিজ্ঞান ভবনটা কোনদিকে হবে জানতে চাইল। চিন্তা করে দেখলাম যদি বলি জানি না তবে সেটা প্রেস্টিজের জন্য খুব একটা সুবিধা হবে না। নিরুপায় হয়ে পার্শ্বের একটা বিল্ডিং দেখিয়ে দিলাম। ক্লাস শেষে বেরিয়ে আসছি এমন সময় দেখলাম মেয়েটিও আমাদের সাথে বেরিয়ে আসছে। তবে আমাকে দেখে তার বান্ধবীকে যে কথাটা বলল সেটা মোটেও শ্রুতিকর কিছু হল না। শুনতে পারলাম বান্ধবীকে বলছে, আমাদের সাথে তো দেখছি একটা গাধাও ভর্তি হয়েছে। ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল এভাবে এবং আমি নিশ্চিত নিম্মি আজ পর্যন- আমাকে গাধার চেয়ে উচ্চতর কোন প্রাণী মনে করে না। বিশ্বজিৎ এর সাথে কথা বলতে বলতে ক্লাসের মিনিট পনের খেয়ে ফেললাম। বাকী তিরশি-চল্লিশ মিনিট ক্লাস করব কিনা ভাবছি, এমন সময় দেখলাম বাক্কু সুমন আমায় দেখে এগিয়ে আসছে। ভাবলাম, যাক আজ আর ক্লাস করতে হবে না। সামনের দিকে কিছুটা ঝুকে হাটে বলে একে আমরা বাক্কু নামে ডাকি। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ হলো নামকরা আতেল। বাংলাদেশে তো অবশ্যই, পৃথিবীতে সম্ভবত খুব কম জিনিসই আছে যেটা সে জানে না। অবশ্য সে জানাটা যে কতখানি বিশুদ্ধ সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তার মুখোমুখি হলেই সে একটা বিষয় নিয়ে লেকচার দেয়া শুরু করবে, যেটার স্থায়ীত্ব কম করে হলেও মিনিট বিশেক হবে। আমি বাক্কু সুমনকে কাটানোর জন্য করিডরে লুকিয়ে পড়লাম। ক্লাস শেষে নিম্মি বের হয়ে আসল। আমি কাধে ঝোলানো ব্যাগ একটা নোট বের করে নিম্মিও দিকে এগিয়ে দিলাম। নিম্মি তোমার ক্লাস নোট। কাজ শেষ? শেষ না, শেষের শুরু। মানে? মানে কপি শেষ পড়া বাকী। ওহ্, তাই বল। বাসায় যাচ্ছ? বাসায়ই যাচ্ছিলাম, কিন্তু রফিকটা জোড় করে ধরেছে। বলাকায় কী জানি একটা নতুন ছবি এসেছে, ওরা সবাই মিলে দেখবে। আমারও নাকি টিকেট কেটেছে। ওদের সাথে যেতে হচ্ছে। ও, আচ্ছা। নিম্মির সাথে কথাবার্তা মোটামুটি এরকম একটা গতানুগতিক রূপ নিয়েই এগিয়ে যায় প্রতিদিন। অন্যান্য বন্ধুবান্ধবদের সাথে যে রকম ঘনিষ্টতা আমার সাথে, যেন ততটাই দূরত্ব নিম্মির। আমাদের কথাবার্তা মূলত দু’চারটা নোট আদান প্রদান বিষয়কই হয়। ছাত্র হিসেবে আমাকে অনেকেই ভালো কিংবা অনেকে ব্রিলিয়ান্ট বলে থাকে। তবে ভালো ছাত্রের যেরকম বৈশিষ্ট্য থাকা উচিৎ সেরকম কিছু আমার কাছে নেই। তবে একটা জিনিস যেটা আছে সেটা হলো স্মরণশক্তি। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার আগে একমাস ঘরের দরজা বন্ধ করে পড়া মুখস- করি আর পরীক্ষার হলে ঢেলে দিয়ে আসি। আশ্চর্য হয়ে আমি লক্ষ্য করেছি, এতেই আমি অবলীলায় ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড, থার্ড কিংবা একবার তো ফার্স্টই হয়ে গেলাম। সুতরাং ছাত্রছাত্রীদের সাথে আমার যে ঘনিষ্টতা আছে সেটা অনেকটা নোটের সূত্র ধরেই। এই পাঁচ বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে কেউ আজ পর্যন্ত- আমাকে বলেনি, দোস্ত, চল একটা ছবি দেখে আসি কিংবা দোস্ত- রূপার অথবা নিলার জন্য একটা চিঠি লিখে দে। নিম্মির সাথে আমার যে সামান্য কথাবার্তা হয় সেটা নোটের মাধ্যমেই। কতবার মনে হয়েছে নোটের ভিতরে লাল কালিতে লিখে দিই, নিম্মি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু কখনই লেখা হয়নি, সম্ভবত কোনদিন হবেও না। কতবার মনে হয়েছে নোট নেয়ার সময় একবার নিম্মির হাতটা ছুঁয়ে দেখব কিন্তু আমি দুর্বল মানুষ, সুতরাং সে সৌভাগ্য আমার কখনই হয়নি। তবুও মনে মনে ভাবতাম থাক, যাকে ভালোবাসি তাকে তো প্রতিদিন একবার অন্তত দেখতে পারছি। ক্লাস, প্র্যাকটিকাল কোনটাই না করে আমি ধানমন্ডির দিকে রওয়ানা হলাম। কাল আমার জন্মদিন। চার বছর হলো জন্মদিনের একদিন আগে প্রতিবছর আমি ধানমন্ডিতে একবার ঘুরে আসি। এখানে আমার মা তার স্বামীর সাথে বাস করেন। প্রতি বছর এই দিনে আমার মনে হয় তাকে গিয়ে একবার বলি, আমার জানতে ইচ্ছা করে আমার বাবা কে? আমার জন্ম নিয়ে আমার বাবার এক ধরণের সন্দেহ ছিল। আমি জন্মানোর আগ পর্যন্ত- এই লোকটা নাকি জানতো তার দ্বারা কখনও সন্তান উৎপাদন সম্ভব নয়। সুতরাং আমার পঁচিশ বছরের জীবনে আমি কখনই আমার বাবা-মাকে হাসি মুখে কথা বলতে দেখিনি। অবশ্য আমি যে আমার মাকে এই প্রশ্ন করতে যাচ্ছি, আমি জানি এটা স্রেফ যাওয়ার ইচ্ছা বলে যাওয়া। আমার দ্বারা কখনই মাকে এরকম কথা বলা সম্ভব নয়। গত চার বছরের মতো এবারও হয়ত আমাকে বাড়ীর গেট থেকেই ফিরে আসতে হবে। তবুও যাওয়া বলেই যাচ্ছি। চৈত্রের এক দুপুর। সকাল থেকে না খেয়ে বিছানায় পড়ে আছি। হলের ডাইনিং বন্ধ, বাইরে যেতে ইচ্ছা করছে না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। একটা লাল করোলা শহীদুল্লাহ হলের গেটে থামল। একটা লাল শাড়ী পরা সুন্দর মেয়ে গাড়ি থেকে নামল। মেয়েটাকে একবার দেখে অন্যদিকে তাকানো যায় না। তবুও আমি চেষ্টা করে দৃষ্টি বড়ই গাছের ডালে বসা কাকের গায়ে ফেললাম। দুটো কাক একটা ডালে বসে আছে। ওরা কী স্বামী-স্ত্রী নাকি প্রেমিক-প্রেমিকা। কা কা করে একটা কাক উড়ে গেল, সাথে সাথে অন্য কাকটাও তার পিছু নিল। দরজায় ঠক্ ঠক্ করে করার শব্দ হচ্ছে। উঠে গিয়ে দরজা খোলার ইচ্ছে হচ্ছে না। বললাম কে, কাকে চান? এখানে কি আতিক ইকবাল থাকেন? - মেয়ে মানুষের কন্ঠ শুনে উঠতেই হল। দরজা খুলে দেখি একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা সবুজ খাম। মেয়েটা যে কে সেটা চেনার জন্য আমাকে একটু কষ্ট করতে হলো। পরে বুঝলাম এটা নিম্মিই। একটা মেয়ে সেলোয়ার থেকে শাড়ী পড়লে যে পুরো পাল্টে যায় সেটা প্রথম বুঝলাম নিম্মিকে লাল শাড়ী পড়তে দেখে। নিম্মি ঘর থেকে ধীরপায়ে বেরিয়ে গিয়ে লাল টয়োটা করোলাটাতে উঠলো। আমি জানালা দিয়ে নিম্মির যাওয়া দেখতে লাগলাম। আমার হাতে সবুজ খাম। আমি খামটা খুলতে লাগলাম, অনুভব করলাম কেউ যেন আমার ভালোবাসাকে এই খামে আটকে ফেলেছে।
জালাল আমার ভাগ্নেগোছের কেই নয়। তবুও সে আমাকে ও নামেই ডাকে, যদিও এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট আপত্তি আছে। এজন্যই ভাগ্নের আবদার হিসেবে আমাকে তার লেখা কিছু অখাদ্য গল্প-কবিতা পড়তে দেয়। আমি অবশ্য গল্প-কবিতার তেমন কিছু জানি না। তারপরও অখাদ্য বললাম, কারণ আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি জালালের গল্প-কবিতার একমাত্র পাঠক আমিই এবং সে শত চেষ্টা করেও এ জিনিস আর কাউকে গেলাতে পারেনি। আমি বললাম, বেশ ভালই হয়েছে, চালিয়ে যাও। জালালের চোখমুখ দেখে মনে হলো সে বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছে অনেকটা।
সকালের নাস্তাটা করতে হলো নুরুর দোকান থেকে। অবশ্য এটাকে সাকলের নাস্তা বলা যায় কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। ঘড়িতে দেখলাম প্রায় একটা বাজে। দুপুরে একটা ক্লাস আছে, যেতে পারলে নিম্মির মুখটা অন্তত একবার দেখা যেত। এই মেয়েটাকে আমি গত পাঁচ বছর ধরে ভালবেসে আসছি, কিন্তু কখনো বলতে পারিনি। ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব দুর্বল মানুষ। এতটাই দুর্বল যে, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরের বছরেই যখন আমার বাবাকে ছেড়ে মা দ্বিতীয় বিয়ে করলেন তখন তার প্রতি রাগ করতে পারলাম না। সুতরাং আমি যে নিম্মিকে আগামী কয়েক মাসেও বলতে পারব না, আমি তোমাকে ভালোবাসি, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকবে না। হয়ত বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিয়ে-শাদী করে জীবন যাপন করব। তারপর একদিন হঠাৎ রাস্তায় তার সাথে দেখা হলে মনে মনে ভাববো এই মেয়েকে আমি একসময় ভালোবাসতাম, সে কি কখনও সেটা জানার চেষ্টা করেছিল। এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আতিফ ইকবাল একটা জলন্ত- সিগারেটকে দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করতে লাগলাম।
ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষাটা বেশ ভালই হল। সম্ভবত এবারও ফার্স্ট ক্লাস থাকবে। সামনে অনেক অবসর। আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে আমি হলেই পড়ে আছি। পরীক্ষা শেষে সবাই বাড়ীতে চলে গেছে, হল অনেকটা ফাঁকা। দু’একজন ছাত্রকে পড়াই আর পাবালিক লাইব্রেরীতে পড়ি। বিকেলটায় অনেক সময় নিম্মির বাড়ীর গেট থেকে বা আমার মায়ের বাড়ীর গেট থেকে ঘুরে আসি।
আরে তুমি - আমি হন্তদন্ত হয়ে বললাম। নিম্মি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। একটা কাঠের চেয়ারে বসে হেসে হেসে বলতে লাগল, তুমি তো কোন খোঁজ নাও না, তাই আমাকেই আসতে হলো। আমি কী বলব বুঝতে না পেরে মাথা চুলকাতে লাগলাম। নিম্মি একটা সবুজ খাম আমার দিকে এগিয়ে দিলো। খামটা দেখেই আমার বুঝা উচিৎ ছিল এটা কীসের। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না, বুঝার জন্য খামটা খুলতে হলো। নিম্মির বিয়ে, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। আমি গালদুটো প্রসারিত করে হাসার চেষ্টা করতে লাগলাম যেন এসময় হাসাই উচিৎ। কিছু বলার মতো খুঁজে না পেয়ে বললাম, পাত্র ভাল, তুমি সুখী হবে। কথাটা শুনে নিম্মি তার মুক্তোর মতো দাঁতগুলো বের করে হাসতে লাগল। কতদিন আমার বলতে ইচ্ছা হতো নিম্মি তোমার হাসিটা দেখলে বুঝা যায় আসলেই মানুষ হাসতে পারে; কিন্তু কোনদিন বলা হয়নি। আজ এ ইচ্ছাটা বড় বেশী করতে লাগল। কিন্তু আজও বলা হলো না। সব কথা কী বলা যায়।
তুমি আসবে। অবশ্যই - আমি তাড়াতাড়ি জবাব দিলাম যেন আমি না গেলে তার বিয়েই হবে না। আমাদের কত কিছুই বলার ছিল, কিছুই বলা হয়নি, না? নিম্মি এই যে কথাটা বলল, আমি এটার কোন অর্থ ধরতে পারলাম না। একটা কথা আমরা ছয় বছরেও বলতে পারলাম না, না? এ কথাটাও আমার বোঝার কথা; কিন্তু আমার মনে হতে থাকল নিম্মি ভুল বলছে। একবার তুমি আমাকে ছুঁয়েও দেখবে না? আমার খুব ইচ্ছে হলো নিম্মিকে একটু ছুঁয়ে দেই। আমি হাত ওঠানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আবিস্কার করলাম কী যেন একটা অদৃশ্য জিনিস আমার হাতকে আটকে রেখেছে। আমার খুব বলতে ইচ্ছা হলো, নিম্মি তোমাকে ভালোবাসি।
আমার আত্নহনন বিষয়ক জটিলতা
তৃতীয়বার আত্নহত্যা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আমার হতাশা আরো প্রগাঢ় হওয়া শুরু করল। মিশিগানে থাকার সময়ও দেশে আমার বাসায় আমার জন্য আলাদা একটা ঘর ছিল। আমার সব ব্যবহৃত পুরানো কাপড়-চোপড়,বইপত্র,ক্রীড়া -সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় পাওয়া পুরস্কার ও সনদগুলো মা সাজিয়ে রাখতেন। মাঝে মাঝে আমাকে মনে পড়লে নাকি তিনি এগুলো পরিস্কার করতেন আর আমার স্মৃতি হাতড়াতেন।এবার দেশে আসার কিছুদিন পরই আমার স্মৃতিধন্য ঘরটি ছেড়ে দিতে হল,আশ্রয় নিতে হল ছাদের একটা চিলেকোঠার ঘরে। ছোটভাই নতুন বিয়ে করেছে ওর নাকি একটা বড় রুম দরকার। আমি আপত্তি করলাম না। আসলে বুঝতে পারছিলাম আমি ধীরে ধীরে অপাংক্তেয় হয়ে পড়ছি। এরকমই হয়! ছাদের ঘরটিতে আমি আমার আলাদা জগত তৈরী করে নিয়েছি।তিনবেলা নিচ থেকে খবার আসে আর আমি চৈত্রের দুপুরে শহরের কাকদের সাথে আড্ডা দেই।সময় কাটে বড় বিষন্নতায়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা মনে পড়ে,মনে পড়ে বন্ধুদের কথা,স্মৃতি হাতড়াই ওদের সাথে তোলা ছবিগুলোতে,আমার জন্মদিনে ওদের দেয়া উপহারে। পনেরটার মত বিশেষ বই আছে আমার,বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার সময় চাপ কমানোর জন্য এগুলো আমি পড়তাম। এদেরকে আমি বলতাম চাপরোধীবিদ্যা।মাঝে মাঝে এই বইগুলোই বারবার পড়ি,চোখ ভিজে আসে আমার। আমার পরিচিত পৃথিবী যে পাল্টে গেছে ,চেনা মানুষগুলো অচেনা ঠেকছে এর কারন একটাই-আমি আমেরিকাতে পড়তে গিয়ে দুইপা হারিয়ে ফিরে এসেছি।লং ড্রাইভে যাচ্ছিলাম আমি আর আমার এক বন্ধু।প্লেয়ারে চলছিল আমার পছন্দের গান জন ডেনভারের i am leaving on a jet plane dont know when i will back again……। আসলেই আমি জানতাম না এভাবে আমাকে ফিরে আসতে হবে।লরিটা নাকি বেশ বড়ই ছিল।অনেকে বলেছে বেচেঁ আছি এটাই নাকি ভাগ্য(!)। আমি আমার পাদুটো হারালাম সাথে আমার বন্ধুটিকেও।মাঝে মাঝে ভাবি ঐসময়ে বন্ধুটির চলে গেলেই ভাল হত,দেশে এসে ঝামেলা করতে হতনা। আমি আমার কাটা পাদুটোর দিকে তাকিয়ে থাকি। চোঁখ চকচক করে ওঠে। হ্যাঁ,আত্নহত্যাই শ্রেয় এটা আরও বেশী করে মনে হল যখন আমি পাদুটো হারালাম। বিদেশে পড়তে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম ওগুলোর একটা গতি হওয়া দরকার,বাবা মাকে একবার অন্তত দেখে মরি এরকম সাত পাঁচ ভেবে আমি কায়েস হাসান যে কিনা যথার্থ মানুষ হওয়ার জন্য ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে বিদেশে পড়তে গিয়েছিলাম সেই আমি দেশে মৃত্যুর জন্য ডিসেম্বরের এক শীতের সকালে স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে ঢাকায় পৌছালাম। প্রথমদিকে আমি ভেবেছিলাম আত্নঘাতি হওয়াটা এমন কঠিন কিছু হবে না,বিশেষত নাস্তিক ধরনের লোকের যখন পরকালের কোন চিন্তা নেই। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ব্যাপারটা যত সহজ হবে বলে চিন্তা করেছিলাম ততটা সহজ হচ্ছে না। আমি প্রথমে ফাঁস দিয়ে চেষ্টা করলাম।ছাদে কাপড় শুকাতে দেওয়ার রশি ফ্যানের সিলিংএ বাঁধলাম। কিন্তু আমার মনে হল সুইসাইড নোট বিষয়ক কিছু লেখা হয়নি,বাসার লোক ঝামেলায় পড়বে। খাতা-কলম নিয়ে বসে পড়লাম।কেন জানি কিছুই লেখা হল না। ঝিম মেরে বসে থাকলাম কিছুক্ষন। মাথার ভিতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। দ্বিতীয়বার আত্বহত্যার চেষ্টাটা খুবই হাস্যকর ছিল। শ্বাস বন্ধ করে ছিলাম একটানা অনেকক্ষন।চিন্তা করেছিলাম এভাবে নিঃশ্বাস বন্ধ করে মারা যাব। কিন্তু সবাই জানে এভাবে মরা যায়না।আমেরিকাতে আমি নানাভাবে মানুষের আত্নহত্যা দেখেছি। কেউ হাতের শিরা কেটে সব রক্ত বের করে মরেছে,কেউ গ্যাসের চুলার জ্বলন্ত শিখার নিচে মাথা দিয়ে মরেছে। দ্বিতীয়বার ব্যর্থ আত্বহনন প্রচেষ্টার পর আমি বুঝতে পারলাম এরকম কোনভাবেই আমার হবে না। তাই শেষবার আমি খুব কাপুরুষতার সাথে ঘুমের ট্যাবলেট দিয়ে আত্নহননের কথা ভাবলাম। পানিভর্তি একটা কাচের গ্লাসে গুনে গুনে পনেরটি ট্যাবলেট মিশিয়ে আমি বসে থাকি,আমার চিলেকোঠার ঘরের ঘড়িটিতে সময় গড়িয়ে যায়,রাস্তার মোড়ের কুকুরটি করুনসূরে ডাকতে থাকে আমার মরা হয় না। পঙ্গু,অপাংক্তেয়,বিচ্ছিন্ন এই আমি একটি আত্নহত্যার স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকি।
আমেরিকা থেকে যখন দেশে ফিরে আসতে হল তখন আমি দেখলাম আমার চারপাশের সবকিছুই কেমন যেন পাল্টে গেছে। বন্ধুবান্ধব আগে যারা ছিল তাদের অনেকেই দেশের বাহিরে ,দেশে যারা আছে তারা বিয়েসাদি করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে থিতু হয়েছে। প্রথমদিকে এরা অনেকেই আসত আমার সাথে দেখা করতে। সান্ত্বনা দিত,বলত দেখিস একসময় দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে। অনেকেই এসে আমাকে দেখে বলার মত কোন ভাষা খুঁজে পেত না। এখন কেমন লাগছে,শরীরের কি অবস্থা এরকম দুচারটা কথা বলে চা-নাস্তা খেয়ে চলে যেত। শুধু বন্ধুবান্ধবই নয় নানান রকম লতায়-পাতায় আত্বীয়স্বজন,পাড়া-প্রতিবেশী যাদের সাথে গত দশ বছরেও কোন যোগাযোগ হয়নি তারাও আসত। বলত ভাগ্যকে কি আর কখনও খন্ডানো যায় দেখ দেশেই কিছু করা যায় কিনা,বসে থেকো না মনের উপর চাপ বাড়বে -এইসব কথাবার্তা আরকি। এইসব হল ভদ্রলোকের কথা। অভদ্রলোকের কথাও কিছু কিছু কানে আসত আমার। মোড়ের চায়ের দোকানদার সেদিন নাকি আমাদের বাসার কাজের ছেলেটাকে বলেছে “হইব না আম্রিকা নানান বেজাতের দ্যাশ,ঐহানে কার লগে কি করছে কে জানে,সব পাপের ফল,আল্লার বিচার”। হ্যাঁ,আল্লার বিচার নিয়েই আমি দেশে ফিরে এসেছিলাম।ধীরে ধীরে আমাকে দেখতে বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিত লোকের আসা যাওয়া কমে যেতে শুরু করেছিল এবং এখন বলতে গেলে আর কেউই আসে না।
আগে রাস্তঘাটে পঙ্গু লোকজন দেখতাম। একজন ভিক্ষুককে পঙ্গু দেখলে আমার কোন অসুবিধা হত না কিন্তু মধ্যবিত্ত গোছের একজন শিক্ষিত যখন দেখতাম স্ক্র্যাচ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বা বেমানানভাবে বসে যাচ্ছে রিকসায় তখন আমার মনের মধ্যে একধরনের প্রশ্ন জাগত এই লোকটা বেঁচে আছে কেন?বেঁচে থেকে সে কি পাচ্ছে? দুনিয়ার হাজারো লোকের অস্বাভাবিক দৃষ্টি উপেক্ষা করে সে কিভাবে বেঁচে আছে তা কিছুতেই মাথায় ঢুকত না আমার,বিকলঙ্গতার চেয়ে আত্নহননই শ্রেয় মনে হত আমার।
শনিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮
আগুন্তকে আপত্তি
রাতুলের বাবার কথা: রাতুলের মায়ের কথা : একটা মেয়ে সন্তানের স্বপ্ন আমার বহু দিনের । রাতুল হওয়ার পর থেকেই আমি স্বপ্নটা দেখতে শুরু করি । সন্তানও নিয়েছিলাম একটা আমরা এর কয়েক বছর পর । একটা ছেলে হয়েছিল আবার । কিন্তু ছেলেটা মাসদুয়েকের বেশী বাঁচে নি । এরপর চাকুরী , রাতুলকে বড় করতে করতে সময় কেটে যেতে থাকে । আমার আর রাতুলের বাবার বিয়ে হয়েছিল খুব অল্প বয়সে তখন আমরা সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি । আমি তৃতীয় বর্ষে পড়তেই রাতুল জন্মগ্রহন করে , আমি তখন বাবারও বাড়ীতেই থাকি । তাই সবসময়ই আমি ভাবতাম নতুন একটা সন্তান নেবার সময় এখনও আছে। এখন যখন আমরা আরেকটা বাচ্চা নেবার কথা ভাবছিলাম তখন হয়ত আমাদের মনে রাখা উচিত ছিল রাতুল অনেক বড় হয়ে গিয়েছে , ওর কথা একবার ভাবা দরকার । আমাদের একটা ভুল হয়ে গেছে , মস্ত ভুল হয়ে গেছে । ওর বাবাকে আমি কথাটা বলতে পারিনি, এড়িয়ে গেছি।রাতুলের সামনে যেতে এখন আমার কেমন জানি একটা লজ্জা লাগে । রাতুলের কথা : আমার মনে হচ্ছে আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি ।
রাতুল অর্ন্তমুখী স্বভাবের ছেলে এটা আমরা জানি । ও একা একা থাকতে চায় , আমরা বেশী কথাবার্তা বলতে চাইলে বিরক্তবোধ করে । এজন্য আমরা ওকে কম ঘাটাই । কিন্তু এবার ঢাকা থেকে গরমের ছুটিতে বাসায় আসলে ওকে কেমন যেন অন্যরকম লাগে , আমাদের সাথে কথা বলা আরও কমিয়ে দেয় । আগে বাসায় এসেই নিয়মমাফিক পড়াশুনা চালু রাখত । ওর আম্মা বলত ঢাকায় তো মেসে পড়াশুনা করই , এখন বাসায় আসছ একটু রিলাক্স কর , বাহিরে বেড়াও,বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা কর । কিন্তু ও যেত না । এবারের ব্যাপারটা কেমন জানি অন্যরকম । পড়াশুনা করে না , টিভিও দেখেনা , সারাদিন রিডার্স ডাইজেস্টের কতগুলো পুরানো সংখ্যা নিয়ে পড়ে থাকে । ওকে দেখলেই মনে হয় ভিতরে ভিতরে বেশ অস্থির একটা ভাব ,অসংলগ্ন কথাবার্তাও বলে মাঝে মাঝে । শুনলাম ওর মার সাথেও নাকি খারাপ ব্যবহার করেছে সেদিন । আমি একটু আশ্চর্য হই । ও বরাবরই ভদ্রগোছের একটা ছেলে । আমাদের সাথে শেষ কবে গলা উচু করে কথা বলেছে তা আমার মনে পড়ে না । আমি রাতুলের হঠাৎকরে এরকম পাল্টে যাওয়াতে আশ্চর্য হই , দুঃচিন্তাও হয় বেশ । সামনে এইচ,এস,সি পরীক্ষা ,রেজাল্টটা খারাপ হয়ে গেলে তো মেডিকেলে ভর্ত্তি হতে সমস্যা হবে। ওর মাকে আমি জিজ্ঞাসা করি কি ব্যাপার কোন সমস্যা হয়েছে নাকি । উঠতি বয়সের ছেলেদের প্রেম বা মেয়ে বিষয়ক সমস্যা থাকে সেরকম কোন সমস্যা হল কিনা , ঢাকায় মেসে নানান ধরনের ছেলেদের সাথে থাকে ওখানেও সমস্যা হতে পারে এগুলোই বলি ওর মাকে । ওর মা বলে না তেমন কোন সমস্যা মনে হয় নেই ,সব ঠিক হয়ে যাবে । আমার কেমন জানি মনে হয় ওর মা কিছু একটা এড়িয়ে যাচ্ছে । আমি ঢাকায় রাতুলদের মেসে ফোন করি , কথা বলি ওর রুমমেটের সাথে । ছেলেটা বলে না আংকেল এখানে কোন সমস্যা হয় নি । পাশের বাসার বদরুল ছেলেটা বয়সে ওর থেকে কয়েক বছর বড় হলেও দেখি রাতুলের সাথে ওর বেশ মিল । আমি বদরুলকেও জিজ্ঞাসা করি কি রাতুল কিছু বলেছে কিনা । এ ছেলেটার কাছেও তেমন কোন সদুত্তর পাই না । আমি এবার আসলেই দুঃচিন্তায় পড়ে যাই , সমস্যার কারন খুঁজে না পেলে সমাধান করি কিভাবে । তাছাড়া আমার সাথে ওর আলাদা একটা দূরত্ব আছে হুট করে জিজ্ঞাসাও করতে পারিনা মেয়েঘটিত কোন সমস্যা কি না ।
রাতুল এবার ঢাকা থেকে আসার পর ওকে কেমন জানি অন্যমনস্ক লাগে । খেতে ডাকলে ঠিকমত আসে না , বলে টেবিলে সাজিয়ে রাখেন পরে খেয়ে নেব । কথাবার্তা কিছু জানতে চাইলে আগে তবু হা -না করে উত্তর চালিয়ে দিত কিন্তু এখন দেখি প্রশ্নটাও অগ্রাহ্য করে , দু-তিনবার জিজ্ঞাসা করলে তবে উত্তর দেয় । আমি বুঝতে পারি ওর কোন একটা সমস্যা হয়েছে , হঠাৎকরে ওর এরকম পাল্টে যাবার কথা নয় । ওর বাবাও বিষয়টা বুঝতে পারে আমার কাছে জানতে চায় । আমি রাতুলকে বারবার জিজ্ঞাসা করি কোন সমস্যা হয়েছে কিনা । ও বলে না কিছু হয়নি । আমি পিছু ছাড়ি না । কয়েকদিন অনবরত জিজ্ঞাসা করার পর ও সমস্যাটা আমাকে বলে । কথাটা বলতে ও একটু ইতস্তত করছিল । আমি ওকে বলি ও যেকোন কথা নির্ভয়ে বলতে পারে। এরপর রাতুল যে কথাটা বলে তাতে আমি খানিকটা বিস্মিত এবং খানিকটা লজ্জিতও হই । ও বলে "আপনারা যে নতুন বাচ্চা নিচ্ছেন এটা আমার পছন্দ না " । আমি লজ্জিত হয়ে পড়ি , কি বলব বুঝতে পারিনা । আমি বলি ছি বাবা-মার মধ্যে সন্তানদের এসকল বিষয়ে আসা ঠিক না।
ঘটনাটা আমি প্রথম শুনি ঢাকা থেকে গরমের ছুটিতে বাসায় ফিরে । ইন্টারমেডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে কলেজে পড়াশুনার খুব চাপ বাসায় বলতে গেলে চার মাসে একবার আসা হয়। সামনে এইচ ,এস ,সির বাছাই পরীক্ষা , পড়াশুনা আরেকটু ভালোভাবে করার জন্যই হয়তোবা গরমের ছুটিটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দিল । আমিও ভাবলাম ভালই হয়েছে ,এবার বাসায় গিয়ে চরমভাবে পড়াশুনা করতে হবে । বাসায় এসে ঘটনাটা আমি প্রথম শুনি বাসার কাজের মেয়ের কাছে । আম্মা- আব্বা অফিসে ,আমি বাসায় এসে সবে ফ্যানটা ছেড়ে ব্যাগটা খুলছি এমন সময় কাজের মেয়েটা বলে ভাইজান খবর শুনছেন , আফনার তো বইন হইব । আমি ভালই আশ্চর্য হই । আম্মা বাসায় ফিরলে দেখি ঘটনা সত্যই, আম্মার পেটটা বেশ ফোলা । আমার কেন জানি কান্না আসতে চায় , লজ্জায় আমি মিশে যেতে থাকি মাটিতে। আমি পড়াশুনা করতে চাই , মনোযোগ বসে না । নানান ধরনের অদ্ভুদ বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকি আমি । এতদিন কারো সাথে প্রথম পরিচয়ে সে জানতে চাইত আমরা কয় ভাইবোন । আমি সবসময় বলতাম আমি একাই । এখন এরকম কাউকে বলতে হবে আমরা দুইজন , আরেকজন আছে সে ছোট , এখনও স্কুলে যায়না । বিষয়গুলো ভাবতে আমার মাথাটা কেমন জানি গুলিয়ে ওঠে , বাসার পরিচিত পরিবেশ অচেনা হয়ে ওঠে , খারাপ ব্যবহারও করি দু-একদিন আম্মার সাথে । আমার চোখে একটা ঘটনা ভেসে ওঠে । স্কুলে থাকতে আমার ফাজিল চাচাতো ভাই সাবেরএকদিন একজনকে জিজ্ঞাসা করেছিল ওরা কয় ভাইবোন । ছেলেটা উত্তর দেয়ার পর সাবের বলেছিল আর কি দুই একজন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমি সাবেরের সাথে ছিলাম , ঘটনাটা দেখে আমি মুচকি হেসেছিলাম । সাবের বেশীদিন বাঁচে নি । এস,এস,সি পরীক্ষা দেওয়ার পর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল । কয়েকদিন হল আমার মনে হচ্ছে সাবের যেন আমার কাছে পিছে আছে । আমাকে সুযোগ পেলেই জিজ্ঞাসা করছে কি আর দুই একজন কি হওয়ার সম্ভাবনা আছে ।
শুক্রবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০০৮
সমান্তরাল সহবাস
একবার মুহূর্তের জন্য গিলে ফেলেছিলাম বৃক্ষসমেত বন
কিন্তু আশ্চর্যমত পেটে গেড়ে গিয়েছিল বৃক্ষেরা
ফলত দানাদার খাদ্য অসহ্য হয়ে উঠেছিল ।
বৃক্ষেরা তরলমত খাদ্য পছন্দ করে
কিছুকাল তাই তরলখাদ্য নিতে হয়েছিল আমার।
দা-কুঠার থাকলে বৃক্ষ কর্তন এমন কঠিন কিছু নয়
মস্তিস্ক নাড়া দিয়ে উঠল আমার
তন্ন তন্ন করে বাড়ি খুজঁলাম,ওসব কিছু নেই(!)
অতঃপর গন্তব্য শৈল্যচিকিৎসক মুখলেছউদ্দীন
ডাক্টারের পেট কাটার বায়না,আমার কাঁটা ছেড়ার ভয়
বললাম পেট কেটে নয়,মুখ দিয়ে টেনে তোলেন
ডাক্টার গম্ভীর "বৃক্ষের মূল গেড়ে আছে পেটে ওটা কাটতে হবে"।
সারাটা জীবন ছায়ায় রেখেছি
আমি কি গাড়ল নাকিওটা কাঁটতে দেই
অতঃপর পাঁচশত টাকা ভিজিট এবং প্রস্থান।
বৃক্ষেরা গেড়েই থাকল ভিতরে
চেষ্টার কমতি থাকল না আমার
মাঝে মাঝে ঝড়ে বৃক্ষের পতন বিষয়ক খবর পড়ি
দস্তুরমত ঝড়ের বেগে বাতাস দেই ভিতরে
কিন্তু কি আশ্চর্যমত
কয়েকটা পাতা মাএ পড়ে ভিতরে
পচেঁ যায়পেটটা ব্যথা হয়ে থাকে কয়েকদিন
ভাবি থাকুক না বরং নিজেই অভিযোজিত হই
পৃথিবীতে আর কটা দিন?
আপনারা হয়ত এতক্ষন বুঝেই ফেলেছেন
একেকটা নারীও একেকটা বৃক্ষ বটে
যাদের গিলে ফেলা যায় সহজেই কিন্তু
উগলানো যায় না।
এতটুকু আশা নিয়েই শুধু আমি এসেছিলাম
ভরা বর্ষায় জোস্না ঝরার রাতে ছিলাম আমি একা
বজরার উপরে,গহীন হাওরে
জলের তরঙ্গে দুলে উঠছিল আমার শরীর
আমি বেতের চাটাইয়ে শুয়ে তারা গুনছিলাম।
আচমকা বৃষ্টি এসে নাড়া দিল-
জল বৃষ্টির মাখামাখি,বায়ুর সাথে মিতালী
অর্ধেক নিকোটিন হাতে নিয়ে
আমি বুঝে চলতাম জল,বৃষ্টি আর বায়ুর আচ্ছাদন।
শুধু এতটুকু আশা নিয়েই আমি এসেছিলাম
শহরের বিষাক্ত বায়ু বুকে নিয়ে আমি আসিনি কবর খুড়তে।
সবকিছু কিনে নেবে তারা
সবকিছু কিনে নেবে তারা
তোমার আমার দেশ ,দেশের মাটি
পদ্মা-মেঘনা-যমুনার মত সব নদী
কিংবা ধর তোমার বাড়ীর সামনের -
লাউগাছের মাথায় বশ করার জন্য রাখা লাউটাও।
এই যে তুমি আইজুদ্দিন রাস্তা দিয়ে হাটছ
সেটা পলাশীর সামনের নির্জন রাস্তাই হোক
অথবা মতিঝিলের সামনের রাস্তাটাই হোক না কেন
কিংবা ধরেই নও মহাখালী ক্যান্টনমেন্টের সাজানো রাস্তাগুলো
সেগুলোও কিনে নেবে তারা।
তুমি রমনা পার্কের যে বেন্চিতে বসে
তাজবিড়ির পড়ে থাকা মোতা খাও প্রতিদিন
সে বেন্চটাও কিনে নেবে তারা
যেমনটা কিনে নেবে পুরান ঢাকার
মোজাফফর আলীর দোকানের চায়ের কাপের চাটুকুও।
সবকিছু কিনে নেবে তারা
ধরে নাও তোমার বাড়ীর সামন দিয়ে
যে মেয়েটা প্রতিদিন বেনীচুল নিয়ে হেটে যায়
তার মাথায় দেয়া তেলটুকুর বোতলও।
কিনে নেবে তারা তোমার জুতা ক্ষয়ে গেলে
তুমি নীলক্ষেতের যে দোকান থেকে ছোল লাগিয়ে নাও
সে দোকানের সব জুতার খোল।
কিংবা ধর তোমার উঠটি মেয়েটা
যে দোকানে ব্রেসিয়ার কিনতে যায়
সে দোকানের সব ব্রেসিয়ারগুলো।
সবকিছু কিনে নেবে তারা
তোমার দেশের জাতীয় সংসদ,সোহরাওয়ার্দী উদ্যান
রমনা পার্ক ,সের্কেটারিয়েট,প্রধানমন্তীর দপ্তর
সূধা সদন,হাওয়া ভবন,সেনা কল্যান ট্রাস্ট কিংবা ধর
পাবলিক লাইব্রেরীর যে টয়লেটগুলো তুমি প্রতিদিন
দুইবার করে ব্যবহার কর
তার দেয়ালের লেখাগুলো পর্যন্ত।
কেনে নেবে তারা তোমার গৃহিনীর হাতের কাঁকন
প্রিয় সন্তানের ব্যবহৃত স্লেট,বাড়ীর চা খাবার পেয়ালা
বিটিভির স্কীন,অফিসের বাস,রাস্তার ম্যানহোল
কিংবা তুমি যে মোজাটা
বছর দুয়েক হল বিরামহীন পড়ছ সেটাও।
কিনে নেবে তারা
তোমার দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ,পাটক্ষেতের সব সবুজ পাতা
অবুঝ কিশোরের বুকে আকড়ে থাকা বইয়ের পৃষ্ঠা
ফার্মগেটের ওভারব্রীজ,সদরঘাটের সব লন্চ ও নৌকা
এমনকি তোমার ঘরে সযত্নে রাখাকোরান শরীফের সব সূরাগুলোও।
তুমি শাহেদ জামান যে দোকানে বসে চা খাও
যে বাজারে বাজার কর
যে ব্যাংকে টাকা রাখ
অসুখের সময় যে হাসপাতালে যাও
অথবা বউয়ের হাতের বালার জন্য
বায়তুল মোকাররমের যে দোকানটায় যাও
কিংবা তোমার ছেলেটাইবা যে স্কুলে যায়
তার সবই কিনে নেবে তারা।
তুমি কেরানী আফসার আলী
যে পান্জাবী-পাজামা পড়ে অফিসে যাও
যে খুশবু শার্টে লাগিয়ে কাজ কর
মাসের শেষে পল্টনে যে মেয়েটার কাছে একবার যাও
তোমার কাজে যে কালী ব্যবহার কর
কিংবা তোমার গৃহিনী যে ডিটারজেন্টে ধোয় তোমার গন্ধ
তারও সব কিনে নেবে তারা।
তুমি ছাত্র ইরু
যে কাগজে কবিতা লেখ
কম্পিউটারের যে স্কীনে ছবি দেখ
ঘর্মাক্ত দেহে বালিশের যে কভারের উপর
মরার মত শুয়ে থাক
অথবা বাংলামোটরের জ্যামে ভিক্ষুকের থালায়
যে আধুলিগুলো ছুড়ে দাও
তারও সব কিনে নেবে তারা।
সবকিছু কিনে নেবে তারা
তোমার দেশমায়ের বুকে আজ
একাত্তরের শুয়োরদের বিষাক্ত নখর।
আমার প্রতিজ্ঞা
আর একবার যদি ঘৃণা কর
এই শেষবার বলে রাখলাম
কেউই রেহাই পাবেনা তোমরা
শরীরে আমার ক্যান্সার কোষ,এইডস এর জীবানু
রক্তকে দূষিত করবো আমি তোমাদের।
আর একবার যদি ঘৃণা কর
বলে রাখছি আমি শহরের বিষাক্ত বায়ুকে
স্তরে স্তরে সাজানো মৃত্তিকাকে
থরে থরে বিছানো গোলাপ আর
অদম্য উৎসাহে লালিত গৃহপালিত জন্তুদের
নিমিষে অনস্তিত্ব দেখবে তোমরা নিজেদের ।
আর একবার যদি ঘৃণা কর
কথা ছাড়াই কেড়ে নেব সব
সবুজ ধানক্ষেত ,হলুদ রঙা ধানের শীষ
চাক ভেঙে তুলে নেব মধু
গাভীর ওলান থেকে মুছে দেব দুধের গন্ধ
আদ্র্ সকালে ঘাস থেকে তুলে নেব শিশির।
আর একবার যদি ঘৃণা কর
কিছুই রেহাই দেবনা তোমাদের
চিত্রিত হরিণের গা থেকে তুলে নেব চামড়া
-জুতা বানাব
জল থেকে তুলে নেব ছায়া
দরিদ্র চিত্রকরের মতো ফেরী করব বাজারে।
ভরা পদ্মার রুপালি ইলিশ আর
গৃহপালিত পাখিদের জড়ানো তন্তু
সবই খেয়ে ফেলব নাস্তার টেবিলে
তোমাদর খাদ্যযন্ত্রের প্রতিটি উপাদান
একেকটি এঁটো হয়ে থাকবে আমার ।
অথচ আর যদি একবার ভালবাস
হাতে আমার লেবুপাতার গন্ধ
সুগন্ধ বিলোতে আপত্তি নেই আমার
বস্তুত সুগন্ধ মাত্রই ছড়াতে ভালবাসে।