রবিবার, ২৪ মে, ২০০৯

গল্প > মাজিদ মুনওয়ারের এক সকাল<

মাজিদ মুনওয়ার ঘুম থেকে উঠলেন সকাল সাড়ে ছয়টায়। গরমের দিন । বেশ সকালই হয়েছে। তার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। ফজরের নামাজটা কাজা হয়ে গেছে এটা না যত বড় কারন তার চেয়ে বড় হল কারন আজকের বয়ানের পয়েন্টগুলো ভোরে লেখা হল না এটা। মফস্বল শহরে একটা মাহফিলে সন্ধ্যার পর বয়ান দেওয়ার কথা তার। মফস্বলের মাহফিল। স্বাভাবিকভাবে অনেক লোকজনই হবে। তার বয়ানটাও তাই ভাল হওয়া দরকার। এই বয়ানে কি কি বিষয় নিয়ে বলবেন সেগুলোই পয়েন্ট আকারে লেখার কথা ফজরের নামাজের পর, এ সময় তার মাথা ভাল খোলে। অথচ তিনি উঠলেনই ভোর হওয়ার অনেক পরে, অসময়ে এখন আবার কাগজ কলম নিয়ে বসতে হবে।

মাজিদ মুনওয়ার বামপার্শ্বে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। ময়না এখনও ঘুমিয়ে আছে। বিয়ের এতদিন পরেও ভোরে না ডেকে দিলে সে ফজরের নামাজ ধরতে পারে না। এত ঘুম ময়নার! ঘুমায়ও তো ঠিক দশটায়। সারাদিন কি এমন কাজটাই করে সে? কাজ বলতে তো সেই সকাল আটটা থেকে বারোটা পর্যন্ত মহিলা মাদ্রাসার মাষ্টারি। বাসায় কাজ করার জন্য দুটো চাকর। বাসার কোন কাজও তাকে করতে হয় না। অথচ তার ঘুম দেখলে মনে হয় দুনিয়ার সব কাজ একা করে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। মাজিদ মুনওয়ার ময়নাকে ধাক্কা দেন। ' এই ওঠ ' । ময়না চোখ ঘষতে ঘষতে উঠে বসে। মাজিদ মুনওয়ার ধমকের সূরে বলেন,' একদিনও তো আমারে জাগায়ে দিতে পারলা না, ফজরটা কাজা হয়ে গেল'।ময়নাও পাল্টা ধমকের সূরে বলে ,' ভোরে উঠবেন কেমনে । সারারাত তো পার্টির কাজ করে আসেন '।

ময়নার কথা অবশ্য মিথ্যা না। কয়েকদিন হল পার্টি অফিসে গভীর রাত অবধি কাজ করতে হচ্ছে মাজিদ মুনওয়ারকে, কালকেই অফিস থেকে বেড়িয়েছেন প্রায় সোয়া বারোটায়। দেশে যুদ্ধপরাধী নিয়ে ডামাডোল শুরু হয়েছে। বিষয়টা নিয়ে পার্টির নেতৃস্থানীয় লোকজন খুব চিন্তিত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ক্ষমতায়, যে কোন কিছুই হওয়া সম্ভব। সামনে দিনে এই বিষয়টা আরো জট পাকিয়ে গেলে পার্টির কৌশলগত দিকগুলো কি কি হবে এগুলো নিয়েই আলোচনা চলছে তিন দিন ধরে। পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতারা থাকছেন, আলোচনা হচ্ছে, মাজিদ মুনওয়ারও সেখানে থাকছেন। মিটিং শেষ করে বেড়িয়ে পড়তে পড়তেই রাত বারোটা পেরিয়ে যাচ্ছে।

সকাল আটটায় ময়না মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যাওয়ার পর মাজিদ মুনওয়ার যখন তার লাল কভারের বয়ানের খাতাটায় লেখা শুরু করবেন বলে ভাবছেন তখন তার মোবাইল ফোনে একটা কল আসে।
- আসসালামুআলাইকুম।
-ওয়ালাইকুম সালাম।
-মাজেদ ভাই কইতায়াছেন।

মাজিদ মুনওয়ারে ভ্রু কুঁচকে যায়। তিনি শান্ত গলায় ' রং নাম্বার ' কথাটা বলে কলটা কেটে দেন। মোবাইল ফোনের অচেনা নাম্বারটির দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারেন কলটা তার কোন আত্নীয়ের কাছ থেকেই সম্ভবত হবে। মাজেদ মনোয়ার থেকে মাজিদ মুনওয়ার হয়েছেন তিনি বেশ আগেই। একজন ইসলামিক স্কলারের নাম মাজেদ, মনোয়ার এইসব হবে এটা কেমন কথা? পিতৃপ্রদত্ত নামটা তিনি তাই পাল্টে দিয়েছিলেন অনেক আগে, তফসীরে কোরআন হওয়ার পরপরই। এলাকার অল্প কিছু লোকজন আর নিকট আত্নীয়রা ছাড়া দেশের সব লোক আজ তাকে মাজিদ মুনওয়ার নামেই জানে। তাই, তাকে মাজেদ বলে সম্বোধন করা মোবাইল ফোনের এ নাম্বারটা যে তার গ্রামের কোন আত্নীয়ের এ বিষয়ে তার কোন সন্দেহ থাকে না। আত্নীয়-স্বজনদের মধ্যে অধিকাংশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা সুবিধার নয়। এরা নানান সময়ে মাজিদ মুনওয়ারকে ফোন করে যন্ত্রনা করে, টাকা পয়সা সাহায্য চায়। যেন তিনি দুনিয়ার সব টাকা-পয়সা হাতে নিয়ে সাহায্য করার জন্য বসে আছেন। মেজাজাটাই খারাপ হয়ে যায়। মাজেদ সম্বোধন করে আসা ফোন ইদানিং তাই তিনি আর সেরকম ধরছেন না।

মাজিদ মুনওয়ার আবার লিখতে বসেন। বয়ানের পয়েন্টগুলোতে যাওয়ার আগে তিনি খাতায় দুটি তারকা চিহৃ দেন। ইদানিং ছোটখাট বিষয়গুলো তার মনে থাকছে না, সবই তাই নোট হিসেবে লিখে রাখতে হচ্ছে। প্রথম তারকার পাশে তিনি লেখেন " দলকে বেশি করে প্রমোট করতে হবে "। গত কয়েকদিনের পার্টির সভাতে এই কথাটা বার বার করে এসেছে। যুদ্ধপরাধী বিষয়ক ডামাডোলের মধ্যে দলের পজেটিভ প্রচারটা ফলাও করে করতে হবে। তারা যে আল্লাহর দল করছেন, তাঁর পন্থা বাস্তবায়নের জন্য জান-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, এটা সর্বসাধারণের মধ্যে আরো বেশি করে ছড়িয়ে দিতে হবে। এজন্য পার্টির যে সমস্থ ইসলামিক স্কলাররা বিভিন্ন মাহফিলে বয়ান করেন তারা যেন বেশি করে ঐ সব বয়ানে পার্টিকে প্রমোট করেন, এটাই পার্টি থেকে তাদের উপর নির্দেশ। মাজিদ মুনওয়ার "দলকে বেশি করে প্রমোট করতে হবে " কথাটার উপর আরেকবার কলম ঘোরান, বোল্ড করা বাক্য তাড়াতাটাড়ি চোখে পড়বে হয়ত এ ভেবেই। এরপর দুই নম্বর তারকার পাশে দ্বিতীয় পয়েন্টটা লেখেন। তিনি লেখেন ," আঞ্চলিকতার টান পরিহার করতে হবে "। আঞ্চলিকতার সমস্যাটা তার যাচ্ছেই না, বয়ানের সময় আঞ্চলিক শব্দ বা টান কথার মধ্যে এসে যাচ্ছে। এই যেমন গত সপ্তাহেই একটা বয়ানে দেশের দুই নেত্রীর কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন "আল্লাহ এই দুই বেডীরে হেদায়েত করুন"। মাহফিলে অনেক আধা নাস্তিক শিক্ষিত লোকও আসে। বয়ানের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললে, কথার মধ্যে আঞ্চলিকতার টান থাকলে তারা ভাববেটা কি? তাদের কাছে তিনি তাহলে পৌছাবেনই বা কিভাবে? তাকে তাই এই বিষয়টাও বেশ ভাল করে খেয়াল করতে হচ্ছে।

পয়েন্ট দুটো লেখার পর মাজিদ মুনওয়ার হাজেরাকে চা দিতে বলেন। হাজেরা এ বাসায় কাজ করে। হাজেরাটা বড় হচ্ছে। ফ্রকের মধ্য দিয়ে শরীরটা প্রায় ফুঁড়ে বের হয়ে আসে । ওদিকে তাকালেই সে ফ্রকটা ঠিকঠাক করে নেয়। মাজিদ মুনওয়ার বুঝতে পারেন বয়স কম হলে কি হবে তার এ দৃষ্টি ঠিকই সে ধরতে পারে। তিনি এও বুঝতে পারেন এই মেয়ে আর বেশিদিন এ বাসায় থাকতে পারবে না। এই মেয়েগুলোর এই এক সমস্যা। ইসলামে দাস-দাঁসির উপর মালিকের যে একটা বৈধ হক আছে হাজারবার নসীহত করার পরও এরা সেটা বুঝতে পারে না। শরীরে দু-একবার হাত দিলেই কেটে পড়ে। সিদ্দিকটা ছিল বলে রক্ষা। একটা চলে গেলে কোত্থেকে কোত্থেকে জানি সে আরেকটা কম বয়স্ক মেয়ে ধরে আনে। অবশ্য করবেনা কেন? তিনি তো তার জন্য কম করেন নি?

হাজেরা চা দিয়ে গেলে মাজিদ মুনওয়ার দারুচিনি আর আদা দেয়া চা টায় চুমুক দিতে দিতে লিখতে থাকেন। গত কয়েকটা মাহফিলে কয়েকটা বড় সূরা তেলাওয়াতের পর তিনি' মুসলমানদের জমিন ' কথাটার প্রচার দিয়ে বয়ান শুরু করছেন। এবারও তিনি এটা করবেন। তবে এবার শ্রোতাদের সাথে ইন্টারাকশানটা আরো বাড়াতে হবে। এবার শুরুই করতে হবে একটা প্রশ্ন দিয়ে। শ্রোতাদের কাছে প্রশ্ন করবেন ' বাংলার এ জমিন কার, খ্রিষ্টানদের? '। গুটিকয় লোক ছাড়া প্রায় সবাই নিরুত্তর থাকবে। সব মাহফিলেই এরকমটা হয়, শ্রোতারা প্রথমে নিরুত্তর থাকে, এদের জাগিয়ে তুলতে হয়। তিনি বলবেন, ' কি? কথা বলেন না কেন? বলেন এ জমিন কি খ্রিষ্টানদের?'। শ্রোতারা তখন সমস্বরে বলবে ' না '। এরপর তিনি পরপর আরো এরকম কয়েকটা প্রশ্ন করবেন। ' বাংলার এ জমিন কি ইহুদিদের? নাসারাদের? বিধর্মী- নাস্তিকদের? '। সবাই প্রতিবার সমস্বরে ' না ' বলার পর তিনি বলবেন , ' তাহলে এবার বলেন এ জমি আসলে কাদের? বলেন কাদের ? মুসলমানদের, জোরে বলেন মুসলমানদের'। শ্রোতাদের কাছ থেকে মুসলমানদের নামটা তিনি আরো কয়েকবার শুনবেন যতক্ষণ পর্যন্ত না চারদিকে ' মুসলমান ' শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। এরপর তিনি গলার স্বর দ্বিগুন বাড়িয়ে বলবেন, ' হ্যাঁ, এ জমিন মুসলমানের, বাংলার এ জমিন হাজী শরীয়তউল্লাহ, শাহজালাল, শাহ মখদুম, ইখতিয়ার উদ্দীন বখতিয়ার খিলজী আর নজরুলদের- রবীন্দ্রনাথদের নয় '। এরপর রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলকে নিয়ে তিনি কয়েকটা তুলনামূলক কথা বলবেন। প্রতিটি মাহফিলেই তিনি এগুলো বলেন, মুখস্ত আছে। এটা অনেকটা এরকম , ' হ্যাঁ , নজরুলের জমিন রবীন্দ্রনাথের নয়। কাজী নজরুল ইসলাম যখন বাংলা থেকে ব্রিটিশদের তাড়াতে কবিতা লিখছিলেন আর সেজন্য জেল খাটছিলেন , তখন রবীন্দ্রনাথ কি লিখছিলেন জানেন ? জানেন তিনি কি লিখছিলেন? '। শ্রোতারা নিরুত্তর থাকবে। তখন তিনি ব্যঙ্গোক্তির সূরে গাইবেন ,' ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা '। গানের ব্যঙ্গাত্মকতার খাতিরেই হোক অথবা বিষয়বস্তুর গুরুত্ব বুঝেই হোক লোকজন হেসে ফেলবে। এটারও দরকার আছে। রসকষহীন বয়ান মাজিদ মুনওয়ার পছন্দ করেন না। কিন্তু লোকজনের এই হাসি মাটিতে ফেলতে দেয়া যাবে না। হাসির শব্দ মিলিয়ে যাবার আগে গলায় একটা প্রকট গর্জন তুলে বলতে হবে,' কি বেয়াদাতি, নাফরমানি কাজকারবার, একমাত্র আল্লাহতায়ালা ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করা শিরক '। মাজিদ মুনওয়ারের এই গর্জন শুনে শ্রোতাদের হাসিমুখ শক্ত হয়ে যাবে। তাদের এই শক্ত মুখের উপরেই ইসলাম শিক্ষার ব্যাপারটা আটকিয়ে দিতে হবে।

মুসলমানের জমিন যে ইসলামের শিক্ষা ছাড়া চলতে পারে না , চলা উচিতও নয় , এ বিষয়টা তাদের ভালভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার যে কি বেহাল অবস্থা চলছে এটা বুঝানোর জন্য মাজিদ মুনওয়ার কয়েকটা ছড়ার আশ্রয় নেন। গত সপ্তাহের মাহফিলে তিনি বলেছেন ' হট্টিমাটিমটিম, তারা মাঠে পাড়ে ডিম, তাদের খাঁড়া দুটি শিং' ছড়াটার কথা, আজকের মাহফিলটায় বলবেন ' আগডুম বাগডুম ' ছড়াটার কথা। মাজিদ মুনওয়ার এই ছড়াগুলো মাহফিলে আবৃতির ঢংয়ে পড়ার সময় কিছুটা বিব্রত বোধ করেন কারন এজন্য তাকে কিছু নির্জলা মিথ্যা বলতে হয়, গল্প বানাতে হয় ছোট মেয়েটাকে নিয়ে। তিনি ঠিক করেন এবার বলবেন এরকম করে,' এই দেশে ইসলামের শিক্ষাকে পাঠ্য করা হয় নি, যা পাঠ্য করা হয়েছে তার থেকে আমরা শিখেছি? কি শিখেছি আপনারা শুনবেন?'। তিনি মুখটা কৌতুকময় করে শ্রোতাদের দিকে এমনভাবে তাকাবেন যে , তারা আসন্ন কৌতুকের সম্ভাবনায় আহলাদিত হয়ে মুখ গোল করে বলবে ' শুনব '। তখন তিনি বলবেন,' আমার ছোট মেয়েটা কয়েকদিন আগে গেছে স্কুলে। সেখানে মাষ্টার কি শেখায় জানেন? শেখায় ' আগডুম '। মেয়ে আমার আগডুম বোঝে না । সে স্যারের কাছে জানতে চায় স্যার আগডুম কি? স্যার তখন বলেন ' বাগডুম ' । মেয়ে বাগডুমও বোঝে না। সে স্যারের কাছে আবার বাগডুম কি জানতে চায়। স্যার তখন বলেন ,' ঘোড়াডুম সাজে' । মেয়ে আগডুম-বাগডুম-ঘোড়াডুমের কিছুই না বুঝে বাসায় এসে আমাকে বলে ,' আব্বা স্কুলে স্যার কি শেখায় কিছুই বুঝতে পারি না '। এখন ভাইয়েরা আপনারাই বলেন আগডুম, বাগডুম, ঘোড়াডুম এইসব কি? এইসবের কি বাস্তবে কোন অর্থ আছে। মানে একেবারে ছোট থেকেই আমরা মিথ্যা শিখে আসছি। এই হল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। অথচ কুরআন-হাদীসে বারবার এসেছে কৌতুক করে হলেও শিশুকে মিথ্যা বলা যাবে না। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেছেন......'। এখানে তিনি একটা বড়সড় আয়াত সূর করে তেলাওয়াত করবেন। মোফাচ্ছেরে কোরআন হয়েছেন বলে অনেকে মনে করে তিনি কোরআনের সব আয়াত আর তার বিশ্লেষণ মাথায় নিয়ে ঘোড়েন। অথচ বাস্তবতা হল কিছুদিন না দেখলেই তিনি অনেক আয়াতেরই কিছু অংশ ভুলে যান। এটা অবশ্য তেমন কোন সমস্যা না। বয়ানের প্রতিটা টপিকের উপর তার লেখা খাতা আছে। মাজিদ মুনওয়ার টেবিলের ড্রয়ারের অনেকগুলো খাতার মধ্য থেকে সাদা কভারের একটা খাতা বের করেন। খাতাটার উপরে লাল মার্কার দিয়ে লেখা ' শিক্ষাব্যবস্থা '। এখানে তিনি শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কিত আয়াতগুলো টুকে রেখেছেন। আয়াতগুলো থেকে উপযুক্ত কয়েকটা আয়াত বের করে তিনি নোট করে রাখেন। উপরে ডাবল কালিতে মোটা করে লেখা ' দলকে বেশি করে প্রমোট করতে হবে ' লেখাটা মাজিদ মুনওয়ারের চোখে পড়ে। তিনি ঠিক করেন বয়ানের এই পর্যায়েই দলকে প্রথমবারের মত প্রমোটের ব্যবস্থা করবেন, বলবেন,' সুতরাং এই শিক্ষাব্যবস্থা পাল্টানোর চেষ্টাটা কিছু লোক করছেন নাকি করছেন না ? কিছু লোক আল্লাহর রাস্তায় কাজ করে যাচ্ছেন কি না? একটি দল ইসলামের পথে আছে নাকি নাই ? আপনারা ইসলামের পথে আছেন নাকি নাই?' । আশা করা যায় এ প্রশ্নগুলোর উত্তর সবাই হ্যাঁ বাচকই দেবে এবং এর পরপরই তিনি বলবেন,' তাহলে আপনারা সেই দলটার সাথে থাকতে রাজী আছেন তো? কারা কারা রাজী আছেন একটু হাতটা উপরে তুলে দেখান তো '। লোকলজ্জার খাতিরেই হোক অথবা বয়ানকারীর চোখের রোষ আটকাতেই হোক প্রায় সবাই হাত তুলবে। তখন তিনি উচ্চস্বরে বলবেন,' মাশাল্লাহ '। এতবড় একটা মাহফিল থেকে দুই চার দশটা লোক যদি দলে না আসে তবে মাহফিল করেই বা লাভটা কি? মাজিদ মুনওয়ার যখন একথা ভাবছেন তখন দরজার কলিংবেলে আওয়াজ হয়।

হাজেরা এসে খবর দেয় স্থানীয় লোকজন নাকি এসেছে কিছু, তার সাথে দেখা করতে চায়। মাজিদ মুনওয়ার খুশি হন। মোহাম্মদপুরের এই বাড়িটা তিনি নতুন কিনেছেন। এলাকার লোকজনের সাথে আস্তে আস্তে ঘনিষ্টতা বাড়ছে। অবশ্য এই পরিচয়ের জন্য তাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হচ্ছে না। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সেই ইসলামিক স্কলার হিসেবে সমঝদারদের মধ্যে তিনি একটা জায়গা করে নিতে পেরেছেন। শহরের অনেক অডিও-ভিডিওর দোকানে তার বয়ানের ভিডিও বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। কাঁটাবন মোড়ের কাফেলা ইসলামিক মাল্টিমিডিয়া সেন্টারের মালিক তো তাকে আগাম টাকাই দিয়ে রেখেছেন বয়ানের কপিরাইট হিসেবে। এছাড়া পার্টির টেলিভিশন চ্যানেলে নিয়মিত বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহন করছেন, শুক্রবার জুম্মার নামাজের পরের এক ঘন্টা তো তার ' ইসলামিক সওয়াল ও জবাব ' অনুষ্ঠানের জন্য বাঁধা। এসব অন এয়ারে যাচ্ছে নিয়মিত , কখনো কখনো পুনঃপ্রচারও হচ্ছে। সুতরাং একটা এলাকায় নতুন আসলে পরিচয়ের জন্য কষ্টটা তাকে করতে হবে কেন?

ড্রয়িংরুমে বসে থাকা ছেলেগুলোর দিকে তাকান মাজিদ মুনওয়ার। অধিকাংশের বয়স আঠারো থেকে চব্বিশের মত হবে। তিনি ধারনা করেন কোন পাবলিক প্রোগামে তাকে অতিথি করার জন্যই হয়ত এরা এসেছে। মাজিদ মুনওয়ারকে দেখে এরা সবাই দাড়িয়ে পড়ে ও হাল্কা স্বরে সালাম দেয়। তিনি তাদেরকে বসতে বলে তাদের আসার কারন জানতে চান। দলের মধ্যে যাকে দেখলে সবচেয়ে বড় মনে হয় সে বলে, ' হুজুর, আমরা নববর্ষ উপলক্ষ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করব পুলিশ ফাঁড়ির সামনের খেলার মাঠটাতে, চাঁদা চাইতে এসেছি সবার কাছে '। ' নববর্ষ ' শব্দটা মাজিদ মুনওয়ারের কানের মধ্য দিয়ে ঢুকে ঠিক যেন কলিজায় গিয়ে আঘাত করে, শব্দটা শুনলেই তার আসমা খানের কথা মনে পড়ে।

বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসায় পড়ার সময় তিনি যখন নান্নুর হোটেলে বিকেলে সিংগারা-পুরী এসব খেতেন তখন ঠিক ঐ সময়টায় নিয়ম করে হাজী বিস্কুট এন্ড কোং এর স্বত্বাধিকারী মোফাজ্জল খান হাজীর মেয়ে আসমা খান হেঁটে যেত হোটেলের সামন দিয়ে। হয়ত প্রাইভেটই পড়তে যেত। বিশ বছরের যুবক মাজিদ মুনওয়ার মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে জুল জুল করে আসমা খানকে দেখতেন। আসমা খানকে কখনো তার লাল কৃষ্ণচূড়া মনে হত , কখনো রজনীগন্ধা, কখনো বা লালপদ্ম। আসমার ফেরার পথেও তাই তিনি দাড়িয়ে থাকতেন নান্নুর হোটেলের সামনে। কিন্তু মাজিদ মুনওয়ারের এই লাল কৃষ্ণচূড়া ধরা হয় নি। সেবার পয়লা বৈশাখে বমনার বটমূলে আসমা খানকে তিনি দেখেছিলেন ছত্তিশ নম্বর বংশাল রোডের সাইকেল ব্যবসায়ী রমিজ সরকারের ছোট ছেলে রফিক সরকারের সাথে। পয়লা বৈশাখ অথবা নববর্ষ শব্দগুলো শুনলে তাই মাজিদ মুনওয়ারের মনটা খান খান হয়ে যায়, রমনার বটমূলে আসমা খানের রফিক সরকারের হাত ধরে ঘুরে বেড়ানো তার চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। তার পুরো ক্ষোভটা অন্যায়ভাবে গিয়ে পড়ে নববর্ষের উপর, যেন সেবার নববর্ষের এই অনুষ্ঠানগুলো না থাকলে আসমা খানকে আপন করে পেতে তার কোন সমস্যাই হত না। মাজিদ মুনওয়ার ব্যক্তিগত ক্ষোভের পরিধি হতে নববর্ষকে কিছুতেই আলাদা করতে পারেন না। কে জানে এই ক্ষোভের কারনেই হয়ত তিনি নববর্ষের আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নববর্ষকে হিন্দুয়ানী অনুষ্ঠান বলে তুলোধুনো করেন। তিনি ভাবেন এই ছেলেগুলো এসে ভালই হয়েছে, সামনে যে একটা নববর্ষ আছে এটা তার স্মরণে ছিল না। নববর্ষর ব্যাপারটাও পয়েন্ট আকারে লিখতে হবে। মাজিদ মুনওয়ার তার ভাগের চাঁদার টাকাটা ছেলেদের দিয়ে দেন। এলাকার ছেলেপুলে, প্রথমেই এদেরকে বাঁধা দিয়ে ক্ষ্যাপানো ঠিক হবে না। কিছুদিন আগে হাত করতে হবে, পরে দু-একদিন ঝেড়ে বয়ান দিলেই এরা লাইনে আসবে। এরকম তিনি বহুত দেখেছেন। ছেলেগুলো টাকা নিয়ে চলে গেল।

মাজিদ মুনওয়ার আবার লিখতে বসলেন। তিনি পয়েন্ট করতে থাকলেন, বলবেন, ' ভাইয়েরা আমার, সামনে নববর্ষ। ঢাকার ভদ্রলোকরা কি করবে জানেন ? সকালে এরা রমনার বটমূলে যাবে, যুবক-যুবতীরা ঢলাঢলি করবে, আর কিছু শিল্পী গলা ছেড়ে গাইবে ' এসো হে বৈশাখ, এসো ,এসো......' । এরা নাফরমান,নাদান। নববর্ষ একটা হিন্দুয়ানী অনুষ্ঠান। আল্লাহতায়ালা আমাদের সৃষ্টি করেছেন আর আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এই প্রকৃতি। আমরা আল্লাহর গোলাম আর প্রকৃতি আমাদের গোলাম। বৈশাখ আসবে বলে তাকে ফুল-ফল আর পান্তাভাত দিয়ে আরাধনা, তাকে বরণ করে নেয়ার জন্য সমস্থ অনুষ্ঠাননাদি সবই ইসলাম ধর্মের বিরোধী। এসবই এসেছে হিন্দুদের পূজা-অর্চনা থেকে। আমাদের পবিত্র ধর্মে এসবের কোন স্থান নাই। যদি কেউ এসবের মধ্যে থাকে তবে সে পরকালে কঠোর শাস্তির ভাগীদার হবে '। কথাগুলো তিনি বলবেন যতটা না জোরে তার চেয়েও জোরে বলবেন,' সুতরাং আপনারা এবার নববর্ষের কোন অনুষ্ঠানে কেউ যাবেন?'। সবাই সমস্বরে ‘ না ‘ বললে তিনি বলবেন,' আলহামদুলিল্লাহ ' ।

মাজিদ মুনওয়ার তার ড্রয়ারের খাতাগুলোর মধ্য থেকে আরেকটা খাতা বের করেন। এটাতে মোটা লাল মার্কারে ' ইংরেজী ' কথাটা লেখা আছে। ইদানিং তিনি মাহফিলে দু-চারটা ইংরেজী বাক্যও বলছেন, মানে যতটা সম্ভব বলতে চেষ্টা করছেন। যারা ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত,হুজুর দেখলেই নাক সিটকায়, মাহফিলের আশেপাশে থাকলে এরা বুঝুক। বুঝুক তিনি হেজিপেজি বা ফেলনা লোক নন, দুচার লাইন ইংরেজীর বিদ্যাও তার পেটে আছে। অবশ্য ইংরেজীগুলো শিখতে তাকে একটু কষ্টই করতে হচ্ছে। তার এক পুরনো বন্ধুকে বাংলা লিখে দিয়ে সেগুলোর ইংরেজী তরজমা তিনি লিখে নিয়েছেন এই খাতাটায়। ঘুরে ফিরে প্রতিটা মাহফিলেই এগুলোর কয়েকটা করে বলেন। অবশ্য এই ইংরেজীগুলোও বলতে তাকে কিছুটা বিব্রত অবস্থায় পড়তে হয়। আবারও কিছু নির্জলা মিথ্যা গল্প বানাতে হয়। গত মাহফিলের ইংরেজীটা তার বেশ পছন্দের। তিনি বলেছিলেন, ' দেশে মূর্খ লোকজনে ভর্তি। ঠিক উচ্চারণে বিসমিল্লাহ বলতে পারে না অথচ হুজুদের এসে জ্ঞান দেয়। সেদিন এক মাহফিলে পেয়েছিলাম একটা এরকম। আমার মাহফিলে এসে সে হুজুরদের বলছে হুজুররা এটা করবেন না, সেটা করবেন না। আমি তাকে বললাম ,' আপনি কে? হু আর ইউ'। সে বলে সে ঐ এলাকার চেয়ারম্যান। আমি তাকে বললাম,' সো ব্লাডি হোয়াট? গেট আউট অফ দিস ষ্টেজ। আমরা চেয়ারম্যানদের পুছি না। এলেম নাই হুজুরদের জ্ঞান দিতে আসছেন। হুজুরদের জ্ঞান দিতে হলে সেটা দেবেন হুজুররা, আলেমরা। আপনি জ্ঞান দেয়ার কে? ' ।

' সো ব্লাডি হোয়াট ' গালিটা মাজিদ মুনওয়ারের বেশ মনে ধরে। এটাকে তিনি আবার ব্যবহার করতে চান। খাতাটা থেকে তিনি আরেকটা বাক্য টুকে নেন। বেশ কয়েকবার প্রাকটিস করতে হবে বাক্যটা। বাক্যটা তার মাথায় ঘুরতে থাকে ' ইন্ডিয়ানদের কখনো বিশ্বাস করবেন না, জাষ্ট লাইক দেয়ার ওল্ড ফাদার দে আর অলসো গোইং টু হেল এন্ড অলওয়েজ ট্রায়িং টু মেক আওয়ার লাইফ হেল'।

মাজিদ মুনওয়ার চোখ বন্ধ করে বিড়বিড়িয়ে বাক্যটা আওড়াতে থাকেন। ' ব্লাডি ইন্ডিয়ান' দের নিয়ে কোন গল্পটা ছাড়বেন সেটা ভাবতে ভাবতে তিনি ঝিমিয়ে পড়েন। ' দলকে বেশি করে প্রমোট করতে হবে' কথাটা তার স্মরণ হয়। ব্লাডি ইন্ডিয়ানদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে কেন একটা দলই করতে হবে তার যুক্তি খুঁজতে খুঁজতে তিনি এই অবেলায় ঘুমিয়ে পড়েন।

>>>>>>>বাকিটুকু পড়ুন...

বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০০৯

আমার কাচের শরীর তাদের কথার তাসে বারবার যেভাবে ভেঙে পড়ে

তারা যখন দ্যাখে , একদিন আমি পেতলের চওড়া প্লেটে শোল মাছের সালুন দিয়ে ভাত খাই, তখন তারা বলে ," আমরাও এইরম খাইছি একদিন "। তারা যখন দ্যাখে , শরীরে আমার শিমুল তুলার মত পলকা শার্ট , যেন সব রং চুরি করেছে একা , চৈত্র মাসের দুপুরে আলো দিয়া সূর্যরে কাপায় , তখন তারা বলে,"এইসব আমরাও পড়ছি কতদিন " । তারা বলে আর হাসে এবং হানা দিতে থাকে আমার সাপ্তাহিক স্বপ্নে , হানা দিয়া বলে, তারাও এরকম স্বপ্ন দ্যাখে প্রতিদিন , তিন বেলা ভাত খাওয়ার মত অনেকদিন তিনবেলাও ।তারা যখন দ্যাখে , আমি ক,খ,গ জাতীয় জিনিসগুলা জোড়া দিয়া শব্দের পর শব্দ সাজাই , কবিতা বানাই, তখন তারা বলে , " এইসব আমরাও কত বানায়েছি , কবিতা " , এবং আমি যখন কবিতায় খেয়ে কবিতায় ঘুমায়ে পড়ি তখনও তারা বলে," আরে , কবিতায় খেয়ে ঘুমায়েছি তো আমরা , এর টা ঘুম না ,চোখ বন্ধ করে মটকা মেরে পড়ে থাকা , ঘুমের অভিনয়"।

যেদিন জন্মায়েছি আমি , শিমুল তুলার দেশে , এক গ্রাম শিমুলতলায় , সেদিন থেকেই তারা শুধু বলে যায় , বারবার বলে যায় ।

তারা শুধু বলে যায় , কখনও আমি শুনি , কখনও আমরা । এমনটা নয় তারা এইসব বলে গেলে কারও কিছু আসে যায় , শুধু আমার কাচের শরীর তাদের কথার তাসে বারবার ভেঙে যায় ।

>>>>>>>বাকিটুকু পড়ুন...

শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০০৯

একটি উত্থান-পতনের গল্প

অনেকদিন পর শহীদ কাদরীর "একটি উত্থান-পতনের গল্প " কবিতাটা মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে । আমি বুঝতে পারি আমার সময় এসেছে , একটি আত্নজীবনীমূলক ব্লগে লেখার সময় এসে পড়েছে । আগে কাদরীর কবিতাটিতে একটু চোখ বুলিয়ে নিন

একটি উত্থান-পতনের গল্প
শহীদ কাদরী
আমার বাবা প্রথমে ছিলেন একজন
শিক্ষিত সংস্কৃতিবান সম্পাদক
তারপর হলেন এক
জাঁদরেল অফিসার ;
তিনি স্বপ্নের ভেতর
টাকা নিয়ে লোফালুফি খেলতেন
টাকা নিয়ে ,
আমি তাঁর ছেলে প্রথমে হলাম বেকার ,
তারপর বেল্লিক
তারপরো বেকুব
এখন লিখি কবিতা
আমি স্বপ্নের ভেতর
নক্ষত্র নিয়ে লোফালুফি করি
নক্ষত্র নিয়ে ;
--------
-------
বাবা যখন-তখন যাকে-তাকে চপেটাঘাত করতে পারতেন ।
আমি কেবল মাঝে-মধ্যে একে-ওকে চুম্বন ছুঁড়ে মারতে পারি ,ব্যাস !
প্রবল বর্ষার দিনে বাবা
রাস্তায় জলোচ্ছ্বাস তুলে স্টুডিবেকারে ঘরে ফিরতেন,
আমি পাতলুন গুটিয়ে স্যান্ডেল হাতে
অনেক খানাখন্দে পা রেখে এভিনিউ পার হ'তে চেষ্টা করি
বাবার নাম খালেদ-ইবনে-আহমাদ কাদরী
যেন দামেস্কে তৈরী কারুকাজ-করা একটি বিশাল ভারী তরবারী,
যেন বৃটিশ আমলের এখনও-নির্ভরযোগ্য কোনো
ঝনঝন ক'রে-ওঠা ওভারব্রীজ ,
আমার নাম খুব হ্রস্ব
আমার নাম শহীদ কাদরী
ছোটো,বেঁটে - ঝোড়ো নদীতে
কাগজের নৌকার মতই পলকা
কাগজের নৌকার মতই পলকা ।

শহীদ কাদরীর এই কবিতাটা মনে হলে আমারও বাবার কথা মনে হয়। আমার বাবা মফস্বল কলেজের শিক্ষক , সাবদার রহমান সরকার । সকালে ঘুম থেকে উঠে চা খেতে বের হন ,মোড়ের চায়ের দোকানে আড্ডা বসান বন্ধুবান্ধবদের সাথে । পুরোদস্তুর ফিটফাট হয়ে মোটরবাইকে রাস্তার ধূলা উড়িয়ে কলেজে যান। ধূলারা যেন তার শত্রু ,উড়ে যাতে চায় চারপাশে । আমি তার ছেলে ইমরুল কায়েস , এখন পর্যন্ত শেখা হয় নি সাইকেলে চড়া , সাঁতারও জানি না। আমার বাবা কলেজ থেকে ফিরে বাইকে করে গ্রামে যান , নিঁখুত চাষার মত আবাদ করেন শষ্যক্ষেত্র , মাছের চাষ করেন পুকুরে , শ্যালো মেশিনের পাহারাদারকে শাসান , ক্ষেতের কৃষকরা অনিয়ম করলে কেঁপে ওঠে । অদ্ভুদ প্রাণশক্তিতে পরিপূ্র্ণ একজন মানুষ তিনি । আমি তার ছেলে , আপাদমস্তক অলস , হতাশ আর বিভ্রান্ত এক যুবক । ঘুমাই সারাদিন , বাইরে বেড়োই কম , হাঁটি আরো কম ,পা ব্যথা করে ,ঘরের এক কোণে বসে পড়া মুখস্ত করি আর ভার্চুয়াল জগতে রাজা উজীর মারি ।

বাবা অল্পবয়সে নৌবাহিনীতে ঢোকেন , পালিয়েও আসেন একসময় । পালিয়ে এসে কলেজ ঢোকেন , বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন । চ্যালেন্জ নিতে উনি ভালবাসেন। আমি তার ছেলে , আমিও পালাই । কলেজে পালাই , বিশ্ববিদ্যালয়ে পালাই ,পড়াশুনা আমার ভাল লাগে না । পালিয়ে গিয়ে কোথাও মাসখানেক থাকব এমনটা আর হয় না , পালিয়ে আবার বাড়িতেই যাই । সুবোধ ছেলের মত দুই দিন পর বাড়ি থেকে ফিরে আসি , আবার পড়া মুখস্ত করতে বসি । চ্যালেন্জ মোকাবেলায় আমার বড় ভয় । চ্যালেন্জরা যেন একেকটা বিরাটাকার বিড়াল , আমি তাদের কাছে ইঁদুরদের মত মুষড়ে পড়ি ।

আমার বাবা রাজনীতি করেন , প্রতিরাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে এগারো-বারোটায় ফেরেন । রাজনীতির মাঠে তার প্রতিপক্ষ আছে , দাঙ্গা-হাঙ্গামার ভয় আছে । আমি তার ছেলে নিতান্ত সাধারণ , দেশ-দশের নেতৃত্ব তাকে দিয়ে হবে না । আমার কোন প্রতিপক্ষ নেই । প্রতিপক্ষকে আমি ভয় পাই , কেউ পতিপক্ষ হতে চাইলে আমি বাঁধা দেই , আমার দাঙ্গা-হাঙ্গামার বড় ভয় । হলের গেটে কেউ মার খেলে আমি চারতলা থেকে লাইট বন্ধ করে দেখি , নিচ থেকে আসা লাঠির শব্দে আমার আমার অন্তরাত্না কেঁপে ওঠে । মারা শেষ হয়ে গেলে তারা যখন উপরে একটা মাথা দেখে আর অন্ধকারকে উদ্দেশ্য করে বলে 'এই উপরে কে দেখে ?' , আমি তখন সরে যাই , আমার মনে হয় এখনই না সরলে কেউ একজন এসে মারতে শুরু করবে আমাকে । আমি মারামারি আর হট্রগোল বড় পাই । এই আমি তেইশ বছরের যুবক ইমরুল কায়েস আপাদমস্তক ভীতু , আজন্ম কাপুরুষ ।

আমার বাবার নিয়ন্ত্রন যোগ্য মানুষের কখনও অভাব হয় না । তিনি যখন কাউকে বলেন 'যাও অমুকটা করে আস' , তখন তারা প্রবলভাবে দৌড়ায় , তাদের দৌড় দেখলে মনে হয় তারা যেন শয্যাগত প্রায় মৃত আত্নীয়ের জন্য 'ও নেগেটিভ' রক্তের খোঁজে দৌড়াচ্ছে ব্লাড ব্যাংকে । আমার এরকম নিয়ন্ত্রনযোগ্য মানুষ কখনও হয় না । আমিও যদি বলি 'যাও অমুকটা করে আস' তখন যাকে বলি সে হয় শুনতে পায় না অথবা অনেক পড়ে বলে 'কি বলেছিলে ভুলে গেছি'। আমি তাদের এরকম ভুলে যাওয়া মেনে নেই , মানুষই তো ভুলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ! আমার বাবার কন্ঠে যেন ইস্রাফিলের শিংগার মত আওয়াজ । একবার যখন তিনি বলেন 'না' তখন চারপাশ যেন গমগম করে উঠতে থাকে , তারাও বলতে থাকে 'না,না, কিছুতেই না ' । আমি সচরাচর না বলি না । না বলতে আমার ভয় হয় । যদি পারতপক্ষে কখনও 'না' বলি , আমার বছরময় সর্দিভেজা গলা বেয়ে উঠতে তার প্রাবল্য কমে আসে , 'হা' এর মত শোনায় খানিকটা । যারা শোনে তারা বলে "হ্যাঁ ঠিকই বলছ ,এই বিষয়টা না হওয়ার কোন কারন নেই'।

আমার বাবা রোমান্টিসিজমে বিশ্বাস করেন । যুবক বয়সে তিনি মন দেয়া নেয়া করেন যার সাথে পরিনত বয়সে তাকেই বিয়ে করেন । রোমান্টসিজমের আতিশয্যে তিনি লেখেন ডায়েরি '"শেফালী নামের মেয়েটি " । সে ডায়েরী পড়লে যে কেউ তাকে রোমান্টিক একটা উপন্যাস বলে চালিয়ে দিতে পারে । আমি তার ছেলে , পুরোটাই যান্ত্রিক ,তেইশ বছর নারীসঙ্গবিহীন , তেইশ বছর নারীস্পর্শবিহীন ,ঘড়ির কাঁটাকে সব বুঝিয়ে দেয়া যুবক। তাদের দেখলে আমার রুক্ষ কন্ঠ আরো রুক্ষ হয়ে ওঠে , হাত পা কেঁপে ওঠে ভয়ে । তাদের কেউ একজন কোন এ সময় বলে ওঠে 'ইওর ভয়েস ইজ ভেরী হার্শ' । আমার রোমান্টিসিজমে আক্রান্ত হতে বড় ভয় হয় ।

আমার বাবাকে আমার একটি প্রাচীন বটগাছ বলে মনে হয় , অনেকেই তার ছায়ায় থাকে , অনেকেই তার ছায়ায় থেকে খুশি হয় । আমার নিজস্ব কোন ছায়া নেই ,আমি কাউকে ছায়া দিতে পারি না । অন্যের ছায়ায় থাকতেই আমি অভ্যস্ত, ছায়া সরে আমি বিপদাক্রান্ত হই । পরগাছা হয়ে আমি বটগাছকে জড়িয়ে ধরতে ভালবাসি । আমার বাবা উত্তর বাংলার এক সময়কার সাহসী যুবক , বর্তমান সময়ের এক কর্মঠ আর প্রানবন্ত মানুষ । আর আমি তার ছেলে জন্ম-জন্মান্তর থেকে নুয়ে আসা মানুষ, উত্তর বাংলার এক আহত যুবক । শহীদ কাদরীর মত আমারও বলতে ইচ্ছে "আমি"-

ছোটো,বেঁটে - ঝোড়ো নদীতে
কাগজের নৌকার মতই পলকা
কাগজের নৌকার মতই পলকা ।

>>>>>>>বাকিটুকু পড়ুন...

সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০০৯

যাপিত জীবন-০৭ : : ফাঁও খাওয়া

একদা হলে ফাঁও খাওয়া-দাওয়ার রোল পড়িল । বাঙালি মাত্রই ফাঁও আলকাতরা পর্যন্ত খাইতে ওস্তাদ । সুতরাং এইরূপ খাওয়া-দাওয়া হইতে নিজেকে বিরত রাখা এই অধমের পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব হইল না । নির্বিবাদ ফাঁও খাইব মনে করিয়া জড়াইয়া পড়িলাম এবং তৎসংলগ্ন কি কি বিপদে পড়িয়াছিলাম তাহাই আজকের ব্লগের আলোচনার বিষয় ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অত্যাসন্ন । হলের মান রাখিবার মরণপণ শপথ লইয়া ছাত্রকূল বৈকাল বেলায় মাঠে কঠোর অনুশীলন করিতে লাগিল । বহুদিন ধরিয়া ক্রীড়াক্ষেত্রে শিরোপার মুকুট না পাইয়া হলের কর্তামহাশয়গণ (প্রভোষ্ট) ভুখানাঙ্গা দিন কাটাইতেছিলেন আর বোধকরি অন্য হলগুলির কর্তাদের নানাবিধ কটুবাক্য শ্রবণ করিয়া দিন গুজরাইতেছিলেন । তাহাদের আর সহ্য হইবে কেন ? আর দেরী না করিয়া তাহারা নিজ নিজ ঘড়িতে চাবি দেওয়া শুরু করিলেন , পারিলে রুমে রুমে গিয়া ছাত্রদের অনুশীলনের নিমিত্তে মাঠে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন । হলে খেলা খেলা করিয়া রোল পড়িয়া গেল ।

এই অধম প্রতিনিয়ত উৎকৃষ্টরূপে দিবা নিদ্রা সারে , আয়েসে ভুরি আর শরীরের ওজন বাড়াইয়া চলে আর সন্ধ্যা যখন প্রায় নামিয়া আসে তখন কুখাদ্য পরিবেশক কেন্টিনে যায় , দুপুরের খানিক পরে প্রস্তুত শুকনা পুরী , সিংগারা , সমুচা ,চপ ইত্যাকার দুষ্পাচ্য খাদ্যসামগ্রী গিলিয়া চলে । কেন্টিন সংলগ্ন দোকানে ছাত্রগনের নির্বিচারে কলাটা-মূলাটা-চকোলেট দুধটা খাইতে দেখিয়া শুকনা সমুচা গলা দিয়া আর নামিতে চাহে না । ইহারা হলের ক্রীড়াবিদ । মাত্রই মাঠে অনুশীলন করিয়া আসিয়া খাবার-দাবার উচ্ছেদ করিতে আসিয়াছে । তা করুক গে । কে না জানে এইসব কর্মে অতিমাত্রায় ক্যালরি ক্ষয়িত হয় , উহারা তো খাবার খাবেই । কিন্তু খাওয়া পরবর্তী তাহাদের কান্ডকারখানা দেখিয়া মনটা আরও উৎসুক হইয়া পড়ে । খাওয়ার পরে ইহারা শুধু বলে অ্যাথলেটিক্স । ব্যস কেল্লা ফতে আর খাবারের মূল্য প্রদানের কোন আবশ্যকতা থাকে না । মনে মনে ভাবি , যাই , গিয়া এটা সেটা খাইয়া বলি অ্যাথলেটিক্স । দেখি কি হয় ? কিন্তু ভীরু মন সায় দেয় না । যদি কিছু হইয়া যায় ।

অধমের রুমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নামী ক্রীড়াবিদের বাস । ইতোপূর্বে দৌড়-লম্ফ -ঝাঁপ এইরূপ ক্রীড়ায় সে হলের পক্ষে নানান সাফল্য বগলদাবা করিয়াছে । এইবারেও তাহার উপর অনেক ভরসা । আমি তাহাকে শুধাইলাম আচ্ছা তাহাদের কলাটা-মূলাটা নির্বিচারে ভোজন এবং তৎপর বকেয়া প্রদান না করিয়া শুধুমাত্র অ্যাথলেটিক্স কথাটি পাড়িয়া সটকিয়ে পড়ার কারন কি ? সে আমাকে যাহা বলিল তাহাতে আমার চক্ষু চড়কগাছ হইল , উত্তেজনাবশত হাত-পা কাঁপিতে লাগিল , বুকে ফাঁও খাওয়ার আশা জাগ্রত হইল । ক্রীড়াবিদদের মাগনা খাইবার জন্য নাকি একখানি বহি আছে । অনুশীলন করিয়া এটা-ওটা খাইয়া যাও আর বহিতে লিখিতে কও । বহির সমুদয় বিল হল হইতে দেওয়া হইবে । ব্যস আর কে পায় ? অচিরেই ক্রীড়াবিদের খাতাটায় নাম লিখিব বলিয়া মনস্ত করিলাম । নাম না হয় লিখিব কিন্তু কোন খেলায় লিখিব ? শরীরের যে হাল তাহাতে দৌড় বা লম্ফ কিছুতেই কিছু পারিব বলিয়া মনে হইল না । ভাবিলাম ঐসবে গিয়া কাজ নাই , সহজ কোন খেলায় নাম দিই । ভুলেও যদি খেলার মাঠে আসল প্রতিযোগিতার দিন যাইতে হয় তাহলে যাতে মানসম্মান যা অবশিষ্ট আছে তাহা নিয়া ফিরিয়া আসিতে পারি । অনেক ভাবিয়া চাকতি নিক্ষেপ খেলায় নাম লিখিয়া আসিলাম । ইহা আর এমন কি খেলা হইবে ? একখানি চাকতি লইয়া দূরে ছুড়িয়া মারিলেই হইল , দৌড়-ঝাঁপের খাটুনিটা নাই ।

খাতায় নাম লিখিয়া ক্রীড়াবিদের সমুদয় সুবিধাদি উপভোগ করিতে শুরু করিলাম । দিবানিদ্রা সারিয়া দোকানে যাই আর মনভরে এটা-সেটা খাই । যেইদিন সন্ধ্যায় ছাত্র পড়াইতে যাইতে হয় সেইদিন ছাত্রের বাটিতে জল-খাবার খাইলেও দোকানেরটা ছাড়ি না । দোকান হইতে বিস্কুটটা-চানাচুরটা-সিগারেটটা আনিয়া রাখি , বেশী রাত্রির হইলে খাইব । অনুশীলনের কোন নাম নেই । অনুশীলনের বালাই কে করিতে যাইবে ? ইহারা তো আর দেখিতেছে না , বহিতে তো ক্রীড়াবিদ হিসাবে নাম আছেই ।

এইভাবে দিন ছয়েক ভালমন্দ মাগনা খাইয়া ভালই যাইতেছিল । কিন্তু সুখ আর কতই কপালে সয় ? সেইবার হলে চাকতি নিক্ষেপকারীর খুব আকাল পড়িল । সর্বসাকুল্যে একজন , সেটা যে এই অধম তাহা আর বলার অপেক্ষা রাখে না । চাকতি নিক্ষেপের মত সহজ একখানি খেলা যাহাতে পায়ের কোনরূপ কষ্ট নাই মাথার কোনরূপ কষ্ট নাই তাহাতে আর ছাত্র থাকিবে না কেন ভাবিয়া আমি নিতান্ত ক্ষেপিয়া উঠিলাম । অবশ্য অধমের ক্ষেপিয়া উঠিবার আসল কারন ইহা নহে । কারনটা এক্ষন বলিতেছি ।

একমাত্র চাকতি নিক্ষেপকারী দেখিয়া প্রভোষ্ট মহাশয় তাহার প্রতি অধিক যত্মবান হইয়া উঠিলেন । তাহার কোনরূপ অনুশীলনের অসুবিধা হইতেছে কি না সে সম্বন্ধে খোঁজ খবর নিলেন । কিন্তু আফসোস কেহই তাহাকে চাকতি নিক্ষেপকারীর কোনরূপ খোঁজখবর দিতে পারিল না । কতিপয় পরিচিত ক্রীড়াবিদ ছাত্রকে তিনি শুধাইলেন তাহারাও তাকে নিরাশ করিল । ছাত্ররা জানাইল এই নামের কোন চাকতি নিক্ষেপকারীকে তাহারা কোনদিন মাঠে অনুশীলনের নিমিত্তে দেখে নাই । মহাশয় মাগনা খাবারের বহিতে খবর নিলেন কিন্তু দেখিতে পাইলেন চাকতি নিক্ষেপকারী প্রতিনিয়ত নিয়মমাফিক খাইয়া গেছে । চাকতি নিক্ষেপকারী গেল কোথায় ? খবর পাঠানো হইল তাহার রুমে ।

সেইদিন বিকেল বিকেল ঘুম থেকে উঠিয়া দোকানে উত্তমরুমে খাইয়া আসিয়াছি । শরীরটা ম্যাজম্যাজ করিতেছিল । আরেকটা ঘুম পাড়িব কি না ভাবিতে ভাবিতে রুমে আসিয়া শুনিলাম এই বৃত্তান্ত । হলের কর্তাব্যক্তি কেউ একজন খুঁজিয়া গিয়াছে । বুঝিলাম , বাপো ইহা অনুশীলনের না যাইবার ফল । চাকতির মত এই অধমও হল হইতে নিক্ষিপ্ত হইতে পারে এই ভাবিয়া এবং খানিকটা ভয় পাইয়া একবস্ত্রে মাঠের দিকে রওয়ানা দিলাম । মাঠের ক্রীড়াবিদেরা অনেকেই দেখিয়া ভ্রু কোঁচকাইল । তাহাতে কাহার কি ? আগে নিজের জান , ইহাকে প্রথমে বাঁচাইয়া লই । সবার সাথে প্রবল বেগে দৌড়াইতে শুরু করিলাম । সর্বশেষ কতকাল আগে দৌড়াইয়াছিলাম বলিতে পারিব না সেটা নিদেনপক্ষে চার-পাঁচ বৎসরের কম হইবে না । বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়া নিতন্ত কুড়েমিপনা পাইয়া বসিয়াছিল । ব্যায়াম নাই , খেলাধূলা নাই , দীর্ঘপথ হাঁটা নাই খালি খাওয়া-পড়া-ঘুম আর খাওয়া-পড়া-ঘুম । হাঁটার কাজে সাইকেল জাতীয় কোন ছোটকাট যন্ত্র ব্যবহার করার সুযোগ থাকিলে হয়ত হাঁটিতামও না । এহেন শরীরে যে দৌড় মানায় না তাহা কে না জানে বিশেষত সেই দৌড় যদি ঘন্টা দেড়েকের হইয়া থাকে । দৌড় শেষে নিতান্ত মুটাইয়া পড়িলাম । দীর্ঘকাল পর শরীরের কলকব্জা জীবন ফিরিয়া পাইয়াছে । ইহাদের বেশী করিয়া সচল হইবার কথা থাকিলেও অবাক বিস্ময়ে দেখিলাম ইহারা পারিলে চিরতরে বন্ধ হইয়া যায় । হাত-পা আর নড়িতে চাহে না । বহু কষ্টে হাত-পা সমেত হলে প্রত্যাবর্তন করিতে সক্ষম হইলাম । আসিয়াই শুইয়া পড়ি, ঘুমের চেষ্টা করিতে থাকি । ঘুম আর ধরে না । রাত্রি যত গভীর হইতে থাকে হাত-পা ততই ব্যথায় ককাঁইতে থাকে । কানে ধরিলাম আর ফাঁও খাইবার আশা এই জীবনে করিব না । যাহা এতদিন খাইয়াছি ভুল করিয়া খাইয়াছি।

পরদিন সবাই ক্রীড়াবিদের তালিকা হইতে হলের একমাত্র চাকতি নিক্ষেপকারীর নাম কাটা দেখিতে পাইল ।

>>>>>>>বাকিটুকু পড়ুন...

রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

কুয়াকাটা-০১

[১] বুয়েটে এক শিডিউলে পরীক্ষা খুব কম সময়েই হয়েছে । এবারও তাই হল। ঈদের আগে একটামাত্র পরীক্ষা ছিল । এটাও নাকি দেয়া যাবে না । মিছিল হল দুইদিন । পরীক্ষা পিছাও , পরীক্ষা পিছাও আওয়াজ । আর বুয়েটের স্টুডেন্ট সবাই জানে এরকম মিছিল হলে পরীক্ষা আর হয় না । এবারও হল না। মাসখানেকের বন্ধ পেয়ে মনে হল এইবারে একটু কোথাও থেকে ঘুরে আসা যাক। সেই কবে একবছর আগে বান্দরবন-বগালেক গিয়েছিলাম এরপর এই এক বছরে শুধু খাওয়া-পড়া-ঘুম আর খাওয়া-পড়া-ঘুম । এই চক্র থেকে বের হতে হবে বলে মনস্ত করলাম । সিদ্ধান্ত হল কুয়াকাটা যাব । কুয়াকাটায় আগে কখনো যাওয়া হয় নি । এখানে নাকি সূর্যাস্ত-সূর্যোদয় দুটোই দেখা যায় । যতদূর চোখ যায় পানি ছাড়া আর কিছু নেই এমন একটা জায়গা থেকে আস্তে আস্তে সূর্য উঠবে আবার সারাদিন গরম ছড়িয়ে পড়ন্ত বিকেলে এই রকমই আরেকটা জায়গা দিয়ে আস্তে আস্তে নামতে নামতে একসময় পানির মধ্যে হারিয়ে যাবে এরকম দুটি দৃশ্য কল্পনা করতেই ভাল লাগছিল ।এ দৃশ্য দেখার জন্য খুব বেশী দেরী করতে হল না । বলামাত্র আরও পাঁচজন রাজী হয়ে গেল । সুন্দরবন-৫ এর কেবিনে শুক্রবার সন্ধ্যায় আমরা ছয়জন চেপে বসলাম ।

[২] লঞ্চে আগে কখনো চড়া হয় নি । সাঁতারও জানি না । সাঁতার শেখার চেষ্টাও করিনি জীবনে । সারাবছরে যে হারে লঞ্চ ডোবে এর আর ভরসা কি ? লঞ্চে উঠে আমি তাই কেবিনের আশে-পাশে সবার অলক্ষ্যে লাইফ জ্যাকেট জাতীয় কিছু খুঁজে বেড়ালাম । এরকম কিছু পেলাম না । কেবিনের দরজার সামনে অবশ্য যানবাহনের টায়ার টাইপ একটা জিনিস দেখতে পেলাম । ভাবলাম যাক এটা দিয়ে অন্তত ভেসে থাকা যাবে ।অন্য পাঁচজন যখন কেবিনের সামনে আড্ডাকেবিনের সামনে আড্ডাকেবিনে আড্ডায় মশগুল আমি তখন এই টায়ার জাতীয় জিনিসটা খোলার চেষ্টা করলাম এবং যারপরনাই হতাশ হলাম ।এখন যদি এটা খোলা না যায় লঞ্চ ডোবার ক্রান্তিকালে এটা কিভাবে খোলা যাবে ভেবে পেলাম না । কুয়াকাটায় বীচে গিয়ে দেখেছি একটা ফুটবল নিয়ে আরামসে পানির মধ্যে ভেসে থাকা যায় । আগে জানলে এদের উপর আর ভরসা না করে নিজেই ব্যাগের মধ্যে একটা ফুটবল নিয়ে আসতাম ! জীবন বলে কথা । ফুটবল পাওয়া কঠিন কিছু হত না । হলের পোলাপাইনের কাছে বিকেলে খেলার জন্য এমনিই ফুটবল থাকে ।

রাতের লঞ্চভ্রমন অদ্ভুদ লাগে । চারিদিকে শুনশান নীরবতার মধ্যে মৃদু শব্দ তুলে লঞ্চটা এগিয়ে যায় । কেবিন পেরিয়ে সামনে লঞ্চের সার্চলাইট , মাঝে মাঝে সেটা জ্বলে ওঠে । লঞ্চের সার্চইটের পাশেলঞ্চের সার্চইটের পাশেএদিক ওদিক ফোকাস করে নদীরে বুক চিরে আলো ফেলে । হু-হু করে মৃদু ঠান্ডা বাতাস এসে চরিদিক ভরিয়ে দেয় । সোজা কথায় বলতে গেলে এক অপার্থিব পরিবেশ ।

[৩] কুয়াকাটা যাওয়ার আগে এক সুশীলের পরামর্শ নিলাম । সে আমাকে বলল লঞ্চে যাবতীয় খাবারদাবার আগে থেকেই এনে রাখবি । লঞ্চের ডিনারের অবস্থা খুব খারাপ আর দামও বেশী সো বেশী টাকাপয়সা দিয়ে খাবাপ খাওয়ার কি দরকার ? আমি এই কথাটা সবার কাছে পাড়লাম । সদরঘাটে রিক্সা যখন পুরান ঢাকা দিয়েই যাচ্ছে সুতরাং ওখানকার কোন দোকান থেকেই রাতের খাবার হিসেবে মোরগ-পোলাও অথবা বিরিয়ানী নিয়ে যাওয়া হোক । কেউ কথাটায় খুব একটা গা করল না , সবাই নাকি লঞ্চের খাবারই খাবে । সুশীলের পরামর্শ কেউ শুনল না । অগত্যা আমি আর এক কুশীল এই দুই কুশীল মিলে পুরান ঢাকার একটা দোকান থেকে মোরগ পোলাও কিনলাম । আমি আবার মোরগ পোলাওয়ের সাথে গরূর মাংসও আলাদা করে কিনলাম । শালারা কথা শুনলি না , লঞ্চে ফালতু খাবার যখন তোরা খাবি তখন দেখিয়ে দেখিয়ে আমরা দুজন এসব খাব । পোলাওয়ের দোকানদারকে বললাম ভাই খাবারগুলো রাত দশটার দিকে খাওয়া হবে সমস্যা তো নাই নাকি ? সে বলল ছমছ্যার কি আছে ? সমস্যা অবশ্য হল , কিছুটা না , সমস্যা ভালই হল ।

রাতে দেখি লঞ্চে খাবারদাবারের বিশাল আয়োজন । দেশী মুরগীর ঝোল , সব্জি , ডাল চচ্চরী । ঘরোয়া রান্না সব । পরিবেশনের সময়ই বোঝা যাচ্ছিল খাবারের কোয়ালিটি বোধহয় ভালই ,অন্তত সুশীল বর্ণিত কুখাদ্য নয় । আমরা দুইজনও আমাদের বাক্স-পেটরা থেকে মোরগ-পোলাও বের করে খাওয়া শুরু করলাম । কুশীল বন্ধু সবাইকে শুনিয়ে পোলায়ের নানান গুনগান গাওয়া শুরু করল । কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম কেস খারাপ । পোলাও টক-টক লাগে কেন ? আমি তাকে কানে কানে বললাম আস্তে চাপা কম পিটা সমস্যা আছে । গরূর যে মাংসটা নিয়েছিলাম গন্ধটা বেশী উঠেছিল বোধহয় তাতেই । আমি তাই বলতে গেলে বসেই আছি খাবার নিয়ে । এখন কি করা যায় । এমন সময় কেবিনে আরেক কুশীল ঢুকল যে এতক্ষন বাথরুমে ছিল । সে এসেই বলল , কি ব্যাপার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে কিসের ? আমি বললাম মোরগ পোলাওয়ের গন্ধ । সে বলল , না এটাতো পঁচা খাবারের গন্ধ মনে হচ্ছে , দেখ তোদের খাবার পঁচি (এই কুশীলের আবার ক্রিয়াপদে হ্রস্ব ই-কার প্রয়োগের বাতিগ আছে ) গেছে । আমরা বুঝলাম হ্যাঁ গন্ধটা মনে হয় বাড়াবাড়ি রকমেরই উঠেছে । খাওয়া আর গেল না বোধহয় । বাকী সবাই তখন লঞ্চের খাবারের প্রয়োজনের অধিক প্রশংসা শুরু করে দিয়েছে । হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে এরা সারাজীবনে এরকম মধুর রান্না আর খায় নাই , যদিও বোঝা যাচ্ছে এই প্রশংসার অধিকাংশই ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে । যাই হোক চিপায় পড়ে আমার দুজন তখন মিনমিনে গলায় ওরা যা খাচ্ছিল সেই খাবারেই অর্ডারই দিলাম । খাবার আসল । খাবার তো ভালই । রান্নায় কোন সমস্যা নাই । খাবারের বাকী পর্বটা ঐ সুশীলকে নিয়ে কুকথা বলেই পার করলাম সবাই ।

[৪] পটুয়াখালী পৌছালাম ভোরবেলায় । লঞ্চঘাটাতেই একটা মাইক্রোবাস পাওয়া গেল । মাইক্রোবাসওয়ালা দেখি পটুয়াখালি থেকে কুয়াকাটা মাত্র আটশো টাকা চায় । বাস ভাড়াই যেখানে প্রতিজনে একশো টাকা করে সেখানে ছয়জনের জন্য কিভাবে সে আটশো টাকা চায় ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল না । মাইক্রোবাসে করে কুয়াকাটার পথেমাইক্রোবাসে করে কুয়াকাটার পথেতার উপরে পটুয়াখালি-কুয়াকাটা রাস্তার বেহাল হাল সবাই জানে । যাই হোক বিষয়টা পরিষ্কার হল একটু পরে । কোন জানি অফিসের মাইক্রোবাস এটা । সকাল দশটার মধ্যে এমনিতেই ওদের কুয়াকাটা যেতে হবে । আমাদের কাছে টাকা-পয়সা যা পাওয়া যাচ্ছে সেটাই ওদের লাভ । সে আমাদের বলে, এ ছাড়া এত সস্তায় কি আর পাইতেন , এই রুটের ভাড়া তো এম্নিতেই পয়ত্রিশশো টাকা । চাপাই কি না কে জানে । আমরা মাথা নাড়ি ও আচ্ছা ! যাই হোক ড্রাইভারেরও লাভ আমাদেরও লাভ । ভাগ্য বটে । পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটার রাস্তাটা যেরকম ভেবেছিলাম তার চেয়ে বেশী খারাপ । কোথাও কোথাও পীচঢালা রাস্তা , কোথাও কোথাও রাস্তার মাঝে ইটের টুকফেরীর অপারেটিং রুমে আমরা দুজন---ভাইজান একটু ফেরী চালাইতাম চাইফেরীর অপারেটিং রুমে আমরা দুজন---ভাইজান একটু ফেরী চালাইতাম চাইরা দিয়ে রাখা আছে হয়ত পীচ ঢালা হবে আর কিছুদিন পর , কোথাও কোথাও রাস্তার মাঝের পীচ বা ইট কিছুই নাই দেখলে মনে হয় কেউ যেন রাস্তাটা প্রবল আক্রোশে খুবলে খুবলে রেখে গেছে । আন্ধারমানিক পার হচ্ছি ফেরীতে করেআন্ধারমানিক পার হচ্ছি ফেরীতে করেযাত্রাপথে ফেরী পার হতে হল তিনটা নদীতে। নদীগুলোর নাম অসাধারণ । একটার নাম আন্ধারমানিক , একটার নাম সোনাতলা । তৃতীয়টা অবশ্য নদী কিনা বোঝা গেল না । খুবই ছোট । নামটাও খালের নামে আলীপুর খাল । দুই-তিনটা ফেরী পাশাপাশী রাখলেই মনে হয় এটা পার হওয়া যেত । তারপরেও এটা একটা ফেরীতেই পার হতে হল । আমাদের মত করে কে আর ভাবে ? কুয়াকাটা পৌছালাম সকাল ১০ টায় । উঠলাম কুয়াকাটা ইনে। ভাল হোটেল । সবার পেট চোঁ- চোঁ করছিল । লাগেজপত্র হোটেলে রেখেই বেড়িয়ে পড়লাম সকালের নাস্তা করতে । সেখানে একটা কান্ড ঘটে গেল । সেটা না হয় আরেক পর্বেই বলি ।

>>>>>>>বাকিটুকু পড়ুন...

শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০০৮

কুয়াকাটা-০২

[১] কুয়াকাটায় কক্সবাজার বা সেন্টমার্টিনের মত এত ওয়েভ নাই যে ঢেউয়ের তালে তালে নাচা যাবে । আমরা ছয়জন তাই কোমড় পানিতে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে খোশগল্প করছিলাম । অধিকাংশই বয়সের দোষে কুশীল আলাপ । এমন সময়ই ভদ্রলোকটির সাথে আমাদের দেখা । সমুদ্রের পানিতে সাঁতরাচ্ছেন আর আমাদের কি জানি বলছেন । কথা ভালমত বোঝাও যাচ্ছে না । শুধু একটাই বুঝলাম হোয়ার ফ্রম ইউ ? আমরা বললাম উই আর ফ্রম ঢ্যাকা । ইউ । তিনি বললেন আই অ্যাম ফ্রম সাইপ্রাস,হ্যাভ ইউ হারড দা নেইম সাইপ্রাস ? সাইপ্রাসে উচ্চশিক্ষার ফেরী করে বেড়াচ্ছে ঢাকার নানান এজেন্সী । পত্রিকা খুললেই বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে "হায়ার ষ্টাডিস ইন সাইপ্রাস "। পড়াশুনা জাননেওয়ালা লোকের তাই সাইপ্রাস শব্দটা না শুনে উপায় নাই । আমরা তাই বলি ইয়েস উই হ্যাভ । মিশ্রিপাড়ায় গৌতমের মূর্তিমিশ্রিপাড়ায় গৌতমের মূর্তিভদ্রলোক এবার আমাদের কাছে আসেন । নানান আলাপ জুড়ে দেন । অধিকাংশই সাইপ্রাসের আলাপ ,ভূমধ্যসাগরের আলাপ । সাইপ্রাস ইজ এ ভেরী নাইস কান্ট্রি নট ক্রাউডেট লাইক দিস কান্ট্রি । এইসব আলাপ আর কি ? আমাদের মেজাজ খারাপ হয় । শালা সাইপ্রাসের গুন গাইতাছস গা , বাংলাদেরশের নিন্দা করছ কির লাইগা ? কথাপ্রসঙ্গে তিনি বলেন আর ইউ স্টুডেন্টস ? আমরা বলি ইয়েস। ফ্রম হয়ার? আমাদের একজন বলে বুয়েট। সে আরও বলে হ্যাভ ইউ হার্ড দিস বিফোর , দিস ইজ বাংলাদেশ ইউনিভারসিটি অব ইন্জিনিয়ারিং টেকনোলজী । ও ইয়া আই হ্যাভ হার্ড দিস ,ইট ইজ বিসাইড ডিএমডিএইচ(ডিএমসি বোঝাইতে চেয়েছে বোধহয়)। আমরা খুশি হই । যাক অন্তত একজন বিদেশীর দেখা পাওয়া গেল যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে চেনে । বিদেশে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালের যে ভাবমূর্তি ! সেদিন চার হাজার টপ লিষ্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা তালিকা দেখলাম । বাংলাদেশের শুধু একটাই বিশ্ববিদ্যালয় আছে সেখানে । বুয়েট । সেটাও তিন হাজারের পর পরে । প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও কোন অস্তিত্ব নাই চার হাজারের মধ্যে ।যাই হোক ভদ্রলোকের সাথে কথা জমে উঠেছে । কথা জমবেই না কেন ? বিদেশ সম্বন্ধে আমাদের অসীম আগ্রহ আর প্রশ্ন । আমরা নানান প্রশ্ন করছি , তিনি উত্তর দিচ্ছেন আর আমরা ,আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে আমি বিশেষ লাইনে আলাপ জমানোর ধান্ধা করছি। বিশেষ লাইনটা কি নিশ্চয় আর বলে দিতে হবে না । এমন সময় ভদ্রলোক (না ভদ্রযুবক ,ইনার বয়স ত্রিশের মত হবে) আসল কথাটি পাড়লেন অ্যাকচুয়ালী আই অ্যাম এ বাংলাদেশী , লিভিং সাইপ্রাস সিন্স টু থাউজেন্ট ত্রি । নাউ ইন বাংলাদেশ ফর পাইভ অর সিকস মান্থস। আমরা মনে মনে ভাবি ও আচ্ছা ,এইজন্যই তুমি বাংলাদেশের নিন্দা কর এরপর তিনি পরিস্কার কুমিল্লার বাংলা বলা শুরু করলেন । ইনার উপর মেজাজটাই খারাপ হয়ে যায় । অযথা ইংরাজী কওয়ার কি দরকার । আমরা কি বাংলা বুঝি না ? নাড়িভূরি নিংড়ে ইংরেজী কইতে কি সমস্যাই না হল এতক্ষন । এখন তো ভালই বাংলা বলছেন ।

সন্ধ্যায় এই লোকের সাথে বার দেখা হয় । বীচে সবাই মিলে ছাতার নিচে আর আরামকেদারায় শুয়ে গল্প করতে থাকি । একসময় ভদ্রলোকের সাথে সম্পর্কটা মাইডিয়ার টাইপ হয়ে ওঠে । কথা শুরু হয় মদ আর মেয়ে নিয়ে । আমরা জিগাই কি গার্লফ্রেন্ড আছে নাকি ? তিনি বলেন হ্যাঁ । সাইপ্রাসের মেয়ে । ওরে ! কত শুটকি রে ।ওরে ! কত শুটকি রে । অতি উৎসাহী হয়ে তিনি তার গার্লফ্রেন্ডের একটা ভিডিও দেখান আমাদের । আমরা বলি ভালই তো । এরপর উনি আরও নানান জাতের মেয়েদের গল্প আমাদের শোনান । টার্কির মেয়েদের গল্প, পূর্ব ইউরোপের পিছনে ছিলমারা মেয়েদের গল্প কি নেই এতে । আমরা অবাক হই ,যারা অবাক হয় না (হয়ত দেশেই অনেক মেয়েদের সাথে দুএকজনের এটা-ওটা আছে!) তারা অবাক হওয়ার ভান করে । আহা! কি আরামেই না ইনারা আছেন । ভদ্রলোক এবার মদের আলাপ শুরু করেন। কতইনা মদের নাম আর কতইনা তার বাহার । আমাদের গলা শুকিয়ে ওঠার জোগার হয় । তিনি আমাদের কাছে জানতে চান কি বিয়ার-টিয়ার চলে নাকি ? আমরা গাঁইগুই করতে থাকি । হ্যাঁ , না , মানে চলে হালকা পাতলা । আমাদের মনে ক্ষীন আশা জাগ্রত হয় । সামান্য বিয়ার বুঝি আজকে গলায় শুটকি না দানবশুটকি না দানব জোটেই । আমরা আরো গল্প জাকিয়ে তোলার চেষ্টা করি । কিন্তু চাইলেই তো আর সব হয় না । আমাদের বিয়ার খাওয়ার আশায় গুড়োবালি দিয়ে এবং ছাতা-আরামকেদারার সামান্যটুকু বিল না দিয়েই তিনি কেটে পড়েন । তাকে নিয়ে বাকি সময়টা কুকথা বলেই কাটে আমাদের ।

[2] কুয়াকাটার আপ্যায়ন নামক রেষ্টুরেন্টটায় কেউ যদি একবার লটপটি খায় এটা স্বীকার করে নেয়া তার কর্তব্য হবে বলে মনে হয় যে এর চেয়ে কুখাদ্য সে সারাজীবনে খায় নি । অনেকে মনে করবেন বাড়িয়ে বলছি কিন্তু আমাদের ছয়জনের এই রেষ্টুরেন্টটায় খেয়ে এটাই মনে হয়েছে । সারারাত জার্নির পর সকালে হোটেলে পৌছেই লাগেজপত্র রেখে বেড়িয়ে পড়লাম ব্রেকফাষ্টের সন্ধানে। যে হোটেলে উঠেছি তার সামনেই একটা রেষ্টুরেন্ট দেখলাম "হোটল আপ্যায়ন" । দেখি বাহিরে চুলায় গরম গরম নান ভাজা হচ্ছে । পেটে সবার ক্ষুধা এত বেশি ছিল যে মনে হচ্ছিল আস্ত এক ডেকচি নান সাবার করে ফেলা যাবে । তাড়াতাড়ি রেষ্টুরেন্টে ঢুকে নান-লটপটির অর্ডার দিলাম । একজন দিল ভাত-মুরগীর অর্ডার। লটপটি-মুরগীর নামে যে খাদ্যবস্তু এল আমি হিসেব করে তার একটা প্রস্তুতপ্রনালী বের করেছি-

একটি ডেকচিতে (হোটেলের রান্না ,বিস্তর লোকজন খাবে ডেকচি তো লাগবেই)পানি নিন । সমুদ্রের পানি হলে ভাল হয় তাতে লবনের খরচটা খানিকটা বাঁচবে । এই পানিতে ফালিফালি করে আলু কেটে দিন যাতে গড়ে প্রতি বাটিতে দুই-তিন ফালা করে আলু পড়ে । এবার এতে লবন-মরিচের গুড়া-তেল-নূন-মসলা ঢালুন । এসব ঢালার সময় খেয়াল রাখবেন এদের পরিমান যেন খুব বেশী না হয় আবার এমন কমও না যে কেউ খেলে বুঝতে পারবে যে এসব কিছুই দেয়া হয় নি অর্থাৎ এমন পরিমান হবে যাতে খেয়ে বোঝা যাবে লাল কাঁকড়ার জন্য খোড়া হচ্ছেলাল কাঁকড়ার জন্য খোড়া হচ্ছেলবন-ঝাল-তেল জাতীয় জিনিসপত্র আছে কিন্তু স্বাদ বোঝা যাবে না । যাই হোক এরপর মিশ্রনটাকে উৎকৃষ্টরূপে জাল করতে হবে যাতে এটা হাল্কা গাঢ় হয় , খুব বেশী গাঢ় করার দরকার নাই জানেনই তো কাষ্টমার ঝোল বেশী খায় , বেশী গাঢ় করতে গেলে ঝোল কমে যাবে । এরপর স্পেসিফিক্যালি ঠিক করতে হবে আপনি কি রান্না করতে চাচ্ছেন । যদি ডিম রান্না করতে চান তবে ডিম সিদ্ধ করে খানিকক্ষন পিঁয়াজ-তেলে ভেজে লাল হয়ে উঠলে তৈরী করে রাখা ঝোলে ছাড়ুন । ব্যস হয়ে গেল ডিম রান্না । কাঁকড়া পাওয়া গেছেকাঁকড়া পাওয়া গেছে লটপটি রান্নার কষ্ট আরও কম । মুরগী ছেলার সময় খেয়াল রাখবেন নখগুলোও যাতে নেয়া হয় (খামাখা এটা ফেলে লাভ কি,কাষ্টমারই তো খাবে !)। নখগুলোর উপরের হাল্কা চামড়াও ছাড়ুন । এবার মুরগীর মাথা ,গলা,গিলা ,চামড়া এইসব মুরগী থেকে আলাদা করে নিন। এবার মৃদু আঁচে মুরগীর এই জিনিসগুলোকে ভাপিয়ে নিতে হবে । অযথা চুলার লাকরি খরচ করার দরকার নাই এজন্য । ভাত যখন রান্না করবেন তখন ভাতের উপর জিনিসগুলো দিয়ে দিন । ওতেই এগুলো আধাসিদ্ধ হবে । এবার আধাসিদ্ধ জিনিসগুলো আগেই তৈরি করে রাখা আলুর ঝোলটাতে দিন । ব্যস তৈরী হয়ে গেল মুরগীর লটপটি।

কেউ বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা এরকম রেসিপিরই একটা লটপটি আমাদের মনে হয় খেতে হয়েছিল আপ্যায়ন হোটেলে । খাওয়ার পর কেউ বলল বমি বমি লাগছে ,কেউ বলল সারা জিন্দেগীতে এর মত কুখাদ্য খায় নি । একটা বিষয়ে সবাই একমত হল যে আর যাই হোক না খেয়ে মারা যাবে সবাই তবুও ঐ রেস্টুরেন্টে আর খাবে না । দুপুরে খাওয়া হল ঐ হোটেলের পাশের হোটেলটায় । সেটাতে অবস্থা এত খারাপ না হলেও খুব একটা সুবিধার না । বাহিরে খাওয়া-দাওয়ার এত অসুবিধা বিধায় সিদ্ধান্ত হল আমরা যে হোটেলে উঠেছি ওখানেই খাই । ওখানে কয়েকবেলা খেতে-খেতে পকেটের এমন হাল হল যে ঢাকায় ফেরাই দুরূহ হয়ে পড়ল। ঐ হোটেলের মালিক নাকি জার্মানী থেকে ট্যুরিজমে পড়াশুনা করে এসেছেন । আসার সময় সাথে করে এনেছেন এক বাবুর্চি । নাস্তার বিল না অন্য কিছু !নাস্তার বিল না অন্য কিছু !মালিক মনে হয় বাবুর্চির বেতন পর্যটকদের খাইয়ে সেখান থেকে আদায় করার কথা ভেবেছেন । একজন খাওয়ার মত একবাটি ডাল বিশ টাকা , সবজী পঁচিশ টাকা । একটা পরাটা খাবেন সেটাও আট টাকা করে , চায়ের দাম দশ টাকা । সকালে ডিম-পরোটা-ডাল-চা নাস্তা করলেই বিল আসে সবাই মিলে পাঁচশ টাকার কাছাকাছি । আলুভর্তা-ডাল-ভাতের বিল সাড়ে চারশ পেরিয়ে যায় । মাছ-মাংসের কথা না হয় নাই বলি । ওগুলো হাজার টাকার নিচে পাওয়ার নয় । এই রকম বিল আর যাই হোক আমাদের মত বেকার ছাত্রদের খুব বেশীদিন দিতে পারার কথা নয় । হলও তাই । চার-পাঁচ বেলা খাওয়ার পর মনে হল এবার ক্ষান্ত হওয়া প্রয়োজন , না হলে সাথের জিনিসপত্র বিক্রি করে ঢাকায় ফিরতে হবে । অতপর অনেক খুঁজে-পেতে ,অনেকের কাছে শুনে একটা সস্তা এবং ভাল হোটেলের খোঁজ পাওয়া গেল । হোটেল আমতলী । এক বৃদ্ধ লোক হোটেলটার দেখাশুনা করেন , অপরিচিতদের "কাহা" বলে ডাকেন । কাহা কি খাবেন ?কাহা আর কিছু লাগব? এই হোটেলের খাবার বেশ ভাল এবং সস্তা । আগেরটার নাস্তার বিল দিয়ে এখানে দুপুর আর রাতের খাবার আমিষ সহযোগে খাওয়া যায় । আমরা থাকতেই বুয়েটের আরেকটা গ্রুপের দেখা হয় কুয়াকাটায় । ওদেরকেও আমরা এই হোটেলটিতে খেতে বলি । কুয়াকাটা থেকে ঢাকায় ফেরার সময় বরিশালে কয়েকঘন্টার জন্য যাত্রাবিরতি নিতে হয়েছিল । এখানে একটা খাবার হোটেল আছে "হোটেল নাজ গার্ডেন" । এখানকার মোরগ-পোলাও আর কাচ্চি বিরিয়ানীও বেশ ভাল ।

>>>>>>>বাকিটুকু পড়ুন...

শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৮

কুয়াকাটা-০৩

[১]মিশ্রিপাড়ায় গেছি বৌদ্ধমন্দির দেখতে । এত বড় গৌতমের মূ্র্তি নাকি বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই । দেখলাম , বেশ বড়ই মূর্তিটা । এরপর মিশ্রিপাড়ায় রাখাইনদের পাড়ায় একটু হানা দিয়ে একটা স্কুলের সামনে এসে পড়লাম । প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাস হাইস্কুল দুটোই একসাথে । আমরা স্কুলের সামনে দাড়িয়ে স্কুলটা দেখছিলাম আর খোশগল্প করছিলাম । এমন সময় ক্লাসরুম থেকে একজন শিক্ষক বেড়িয়ে আসেন । হ্যালো,আই আম এন এসিসটেন্ট ইংলিশ টিচার অব দিস স্কুল । আমরা কুয়াকাটায় সাইপ্রাসিয়ান বাংঙালি ভদ্রলোকের সাথে কথা বলে যেরকম অবাক হয়েছিলাম তার চেয়েও বেশী অবাক হয়ে পড়ি । ব্যাপার কি ? সবাই ইংলিশ কয় ক্যা? আমরা বলি ও , আচ্ছা । ভদ্রলোক এবার স্কুলের গুনগান গাইতে শুরু করেন। দিস স্কুল হ্যাজ এ গুড রেজাল্ট ইন এস,এস,সি এক্সামিনেশন । লাষ্ট ইয়ার এইট স্টুডেন্টস ফ্রম দিস স্কুল গট A+ অ্যান্ড টু অব দেম ওয়ার গোল্ডেন A+ । আমরা বলি ,ও আচ্ছা , বেশ ভাল রেজাল্ট তো । ভদ্রলোক এবার বলেন, ইউ ওয়ান্ট টু সী সামথিং মোর অব দিস স্কুল ? আমরা একটু ইতস্তত করি । না মানে ইয়ে ......। অবশেষে আমাদের মধ্যে একজনের আগ্রহে হ্যাঁ বলি । উনি আমাদের সাথে করে হাইস্কুলের একটা কামড়ায় নিয়ে যান । রুমে চার-পাঁচটি বেঞ্চ বসানো । এর মধ্যে সমকোনে রাখা দুটি বেঞ্চে বসে পাঁচ-ছয়জন ছাত্র পড়ালেখা করছে । ভদ্রলোক বলতে শুরু করেন । দিস স্টুডেন্টস উইল অ্যাপিয়ার ইন দ্যা জুনিয়র স্কলারশিপ এক্সামিনেশন দিস ইয়ার । আই অ্যাম ট্রাইয়িং টু টেক এক্সটা কেয়ার অব দেম এন্ড ট্রাইয়িং মাই লেভেল বেষ্ট । ইউ ক্যান টেষ্ট দিস স্টুডেন্টস । আমরা বলি , না , ঠিক আছে । কিন্তু ভদ্রলোক ক্ষাম্ত দেন না । প্রথম বাংলা শুনি এবার আমরা তার মুখে । এই ট্রান্সলেশন কর, আমি একজন ইন্জিনিয়ার হতে চাই ......। তিনি আবারো ইংরেজী শুরু করেন । ইউ ক্যান আস্ক দেম অ্যাবাউট দেয়ার এমবিশন অব দেয়ার লাইফ । আমাদের কথা বলার আগেই ছাত্রদের বলেন, টেল ইন ইংলিশ হোয়াট ইউ ওয়ান্ট টু বি ইন ইওর লাইফ । ছাত্ররা একজন একজন করে দাড়ায় আর বলে কে জীবনে কি হতে চায় । কেউ ডাক্টার হতে চায় , কেউ ইন্জিনিয়ার । ভদ্রলোক ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন , দিস পিওপল আর ফ্রম বুয়েট এন্ড দে আর গোয়িং টো বি ইন্জিনিয়ার । ইফ ইউ ওয়ার্ক হার্ড ইউ ক্যান অলসো গো দেয়ার । ছাত্ররা মাথা নাড়ে । ইয়েস স্যার । আমাদের নিয়ে ভদ্রলোক বেড়িয়ে পড়েন । ইফ ইউ হ্যাভ টাইম ইউ ক্যান মিট আওয়ার হেডমাষ্টার । আমরা বলি , না ,ঠিক আছে , আজকে আর না । প্রাইমারী স্কুলটার মনে হয় টিফিন চলছিল । খোলা মাঠে অনেক ছাত্রছাত্রী খেলাধুলা করছিল । আমরা বলি , এসো তোমাদের সাথে ছবি তুলি । সবাই এরা ছবির জন্য দাড়িয়ে যায় । ডিজিটাল ক্যামেরার ক্লীক শুনেই সবাই দৌড়ে যায় অমরের কাছে । সেই ছবি তুলছিল । সবাই ছবি দেখতে চায় । সবাইকে ক্যামেরায় তোলা ছবি দেখিয়ে মুক্তি পেতে হয় ।

[২]বাহিরে কোথাও বেড়াতে গেলে সবাই মিলে টাকা-পয়সা দিয়ে আমরা একটা ডেটাবেস তৈরী করে নেই । যাতায়াতের ভাড়া ,হোটেল ভাড়া ,খাওয়া খরচ এইসব এই ডেটাবসে থেকেই দেয়া হয় । আর প্রতিবার এই ডেটাবসের ম্যানেজারের কাজটা আমাকেই করতে হয় । এবারও ম্যানেজার ছিলাম কিন্তু এবার দু-একটা ছোটখাট ঘটনা ঘটে গেছে এবং এ থেকেই বুঝে গেছি বয়স বাড়ছে , বুড়ো হয়ে যাচ্ছি । এধরনের ভুল সাধারনত বুড়োদেরই হয় ।

ঘটনা-১ : ফাতরা বনে যাব । নদী আর সাগরের একটা মোহনা পাড় হতে হয় ট্রলার দিয়ে । ট্রলার ভাড়া ঠিক হল ৩৫০ টাকা । ফাতরা বনে গিয়ে ট্রলারওয়ালারা ৫০ টাকা চাইল , চা-নাস্তা খাবে । দিলাম । ফাতরা বন থেকে ফিরে এসে ৩০০ টাকা দিতে হবে । খুচরা টাকা নেই , সব পাঁচশো টাকার নোট । ট্রলারওয়ালা একটা দোকানে নিয়ে গেল । দোকানদার ২০০ টাকা দিল ৫০০ টাকার নোটটা নিয়ে । আমরা ভ্যানে চড়ে রওয়ানা হলাম কুয়াকাটার দিকে । মিনিট ত্রিশেক হওয়ার পর পিছনে কার জানি উচ্চস্বরে ডাক শুনে দুটা ভ্যানই থামানো হল । দেখি সাইকেল নিয়ে ট্রলারওয়ালা এসে হাজির । বুঝলাম ঝামেলা আছে । হয়ত যে পাঁচশ টাকার নোটটা দিয়েছিলাম সেটা জাল । মাইর আজকে একটাও বোধহয় মাটিতে পড়বে না। ট্রলারওয়ালা অনেক জোরে সাইকেল চালিয়ে এসেছে । সে এসেই হাঁপাতে শুরু করল , আপনাদের মধ্যে কে টাকা দিল তখন । একজনকে দেখিয়ে বলল আপনি না । সেই একজনও বোধহয় ভয় পেয়ে গেল । সে বলল না আমি না । আমি তখন আর সরাসরি ট্রলারওয়ালাকে বললাম না আমি দিয়েছি টাকা তার বদলে বললাম কেন কি হয়েছে ? সে বলল টাকা তো দেননি । আমি আকাশ থেকে পড়লাম । কেন পাঁচশ টাকার নোট যে দেওয়া হ , দিয়ে দুইশ টাকা নেওয়া হল । না টাকা দেননি , দেখেন । আমি মানিব্যাগ বের করে টাকাগুলা গুনলাম । না আসলেই টাকা দেয়া হয় নি । একটা পাঁচশ টাকার নোট বেশী দেখা যাচ্ছে । ট্রলারওয়ালার কাছে মাফ-টাফ চেয়ে নোটটা দেয়া হল।

ঘটনা-২ : প্রতিটা বীচেই বীচের পাশে মনে হয় শামুক-ঝিনুকের দোকান থাকে । এখানেও আছে । পোলাপান সবাই মিলে হল্লা করে নানান জিনিস কিনল সেখান থেকে । আমিও দুয়েকটা জিনিস কিনব বলে দোকানে গেলাম । কি কিনি ? কেনার মত কিছুই না পেয়ে তিনটা ঝিনুকের মালা কিনলাম । এই মালা দেওয়ার মত কেউ নাই ,এমনকি ছোটবোনও নাই যে দেব । তারপরেও কেনা । দোকানে টাকা পয়সা দিয়ে মালার প্যাকেটটাও মনে হল নিয়েছি কিন্তু ত্রিশ-চল্লিশ পা যাওয়ার পর মনে হল আসলে প্যাকেটটা আমার কাছে নাই । সামনে সবাই দাড়িয়ে ছিল । এদের বললাম ঐ তোরা আমার প্যাকেটটা নিছস নাকি?

-কিসের প্যাকেট?

-ঐতো কয়েকটা জিনিস কিনছিলাম ঝিনুকওয়ালদের দোকান থেকে । ঐ প্যাকেটটা কি তোদের কাউকে দিছি । তোরাও তো আশেপাশে ছিলি ।

-কি কিনছিলি ? অনেকের প্রশ্ন । খাজনার চেয়ে বাজনা বেশী হলে যা হয় আরকি।

-ঝিনুকের মালা কিনছিলাম কয়েকটা ।

-কারে দিবি ? এর আগেও কক্সবাজার থেকে যে মালাগুলি কিনছিলি তার খবর কি? কারে দিসছ ?

-কাউরে দেইনি । আছে , আমার কাছেই আছে । বউরে দিমু । এবারের গুলাও বউরে দিমু ।

-বউতো নাই ।

-আরে ব্যাটা আজকে বউ নাই বইলা যে কালকে হইব না তার কি গ্যারান্টি । এত প্যাঁচাইতেছোস ক্যা ? মালা কাউরে যদি দিয়া থাকি তো ক ।

সবাই একসাথে হেসে ওঠে ।

- আর হইছে বউ । এহন পর্যন্ত প্রেমই করতে পারলি না..................। না আমাদের মালা দিস নি । ঐ দোকানেই আবার যা খুঁইজা দেখ ।

আবার মালার দোকানটাতে যাই । দোকানদারকে বলি ভাই দেখেন তো আশেপাশে খুঁজে । মালার প্যাকটটা মনে হয় নেই নাই । এখানেই কোথাও ফেলে গেছি মনে হয় । দোকানদার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আশেপাশে খোঁজে । কোথায় আর থাকব , আপনে তো নিয়াই গেলেন । দোকানদার প্যাকেটটা আর খুঁজে পান না । দোকানদারের সাথে একজন লোক বসে ছিলেন । তিনিও বলেন তার নাকি স্পষ্ট মনে আছে আমি দোকান থেকে প্যাকেটটা নিয়ে বের হয়েছি । আমি মনে মনে বলি ভাই আমারওতো স্পষ্ট মনে আছে আমি প্যাকেটটা নিয়েই বের হৈছি । কৈ রাখলাম । পরীর আছর পড়ল নাকি ? প্যাকেটটা আর পাওয়া যায় না ।

নিজের খবর আর নিজে রাখতে পারছি না । বিশেষ কাউকে মনে হয় খুব দরকার !

>>>>>>>বাকিটুকু পড়ুন...

সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০০৮

যাপিত জীবন-০৬ : : আপনার আরডস নাম্বার কত ?

<১> কয়েকদিন আগে গ্রাফ থিওরির ক্লাসে স্যার জিজ্ঞাসা করলেন তোমাদের কারও কি নিজের আরডস নাম্বার জানা আছে । আমরা আকাশ থেকে পড়লাম । কে এই আরডস ? আমাদের কাছে কি আদৌ তার কোন নাম্বার থাকার কথা ? থাকলে জানি না কেন ? মহাখাপ্পা বিষয় হয়ে যাচ্ছে না ! তবে স্যার যখন জিজ্ঞাসা করছেন তখন নিশ্চই আমাদের আছে ! আমরা সবাই আরডস নাম্বার থেকেও না জানার বিহবলতা থেকে তার দিকে তাকালাম । স্যার বলতে শুরু করলেন ।

আরডস সাহেব একজন হাঙ্গেরিয়ান গণিতবিদ । গণিতবিদ তো কি হয়েছে ? কেন তার নম্বর থাকবে ? আসলে আরডস সাহেব ছিলেন একজন অমানুষিক(!) গণিতবিদ । ওনার ১৫০০ খানা গণিত বিষয়ক রিসার্চ পেপার আছে । যারা রিসার্চ কাজে আছেন তারা জানেন এতখানা বিসার্চ পেপার থাকার মানে কি ! আরডস এই বিশাল কাজগুলো করেছেন ৫১১ জন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে । এই সাঙ্গপাঙদের আরডস নাম্বার ১ আর আরডস সাহেবের নিজের আরডস নাম্বার ০ । আরডস নাম্বার ২,৩ এগুলো তাহলে কাদের । আরডস নাম্বার ২ হল তাদের যারা আরডসের সাঙ্গপাঙদের সাথে অন্তত একখানা পেপার বের করতে পেরেছেন যদিও এরা সরাসরি আরডসের সাথে কোন কাজ করেন নি । এভাবে আরডস নাম্বার ৩ কাদের সেটা এখন নিশ্চয় বুঝতেই পারছেন।

স্যার এটা বলার পর আমরা বুঝে গেলাম যে আমাদের আরডস নাম্বার ১ হওয়ার কোন কারন নেই কারন আরডস সাহেবের সাথে কাজ কোনদিন করেছি বলে মনে পড়ে না ! আরডস নাম্বার ২,৩,৪ কিছু একটা হওয়ার কারন থাকতে পারে কিন্তু সেটা নির্ভর করছে স্যারের উপর । অনেকেই তো ওনার আন্ডারে থিসিস করছি । যা-তা করে খেটেখুটে স্যারের সাথে একটা পেপার বের করলেই হল । ব্যস আরডস নাম্বার আর ঠেকায় কে ? স্যারের আরডস নাম্বারের সাথে ১ যোগ করলেই হবে । আমরা আরডস নাম্বার প্রাপ্তির আশায় স্যারের মুখের দিকে তাকালাম । স্যার বললেন তার আরডস নাম্বার ৩ হতে পারে । মুখটা চকচক করে উঠল আমাদের । ৪ আরডস নাম্বার প্রাপ্তি তাহলে সময়ের ব্যাপার মাত্র ? যাক না আর কয়েকটা দিন ।



<২> আরডস সাহেবের কিছু মহান উক্তি -

১। শিশুরা হল এবসাইলন (গণিতে ক্ষুদ্র ধনাত্বক মান সূচিত করতে এবসাইলন ব্যবহৃত হয়) ।
২। নারীরা হল বস(Boss) , নররা কৃতদাস (!)।
৩। যে গণিত করা বন্ধ করেছে সে মৃত ।
৪। বিবাহিত পুরুষ বন্দী ,অবিবাহিত পুরুষ মুক্ত ।
৫। সঙ্গীত মানে হল গোলমাল , কলরব , অহেতুক শব্দ ।

>>>>>>>বাকিটুকু পড়ুন...

শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০০৮

যাপিতজীবন -০৫: : গাঁজাখুরি

ঢাকা শহরে থাইকা চোখ আর কানের ব্যায়াম বেশি হয় , চোখ আর কানের ব্যায়াম কম হওয়া দরকার , মামুন কয় । আমি কই, হ ,উচিত কথা , চোখ আর কান কি হাত-পায়ের পেশী , ব্যায়াম কইরা ফুইলা তোলন লাগব ,এদের দুইটার ব্যায়াম যত কম হয় তত ভাল । সে কয় , চোখের ব্যায়াম কম করন খুব কঠিন , চোখ হালায় এমুন ফাউল খালি ব্যায়াম কইরতে চায় , অনেক কষ্ট কইরা রাত্রে চোখ বন্ধ করন লাগে , দিনে রাস্তায় রুজ পাউডার মাখা মাইয়াগো দিকে চাইয়া রয় , কারও কথা শোনে না , এরে ব্যায়াম কম কইরতে কবা ক্যামনে ? আমি কই , হ , কানের ব্যায়ামও কিন্তু কম হয়না সারাদিনে , ইচ্ছা নাহইলেও এইটা ব্যায়াম করে । সকালে কাঊয়ার ডাকে এর ব্যায়াম শুরু , সারাদিন ক্লাসমেট-বন্ধুবান্ধবের , ক্লাসে স্যারের বগরবগর , রাত্রে কি শান্তি আছে ? চট্রগ্রাম থাইকা পাইকারী মাল নিয়া চানখারপুলমুখী অথবা চানখারপুল থাইকা মাল খালী কইরা চট্রগ্রাম অভিমুখী ট্রাকের ঘোঁঘোঁ শব্দে ঘুমের মইধ্যেও কানের ব্যায়াম হয় , আমি তো কই কানের ব্যায়ামই চোখের চাইতে বেশী ।সে কয় , ঠিক কইছ , এই দুইটার ব্যায়াম কিছুদিন বন্ধ করন দরকার । আমি কই , ঠিক কইছ । সেও আবার আমারে কয় , হ ঠিক কইছ । এভাবে আমরা দুইজনে ঠিক কইছ কইতে থাকি যদ্দিন না দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট থানার করতোয়া নদীর পাশের নদীর অববাহিকা অথবা নদীর চরে যাই , গিয়া কান আর চোখ ঠান্ডা কইরা নিয়া আসি ।

নদীর চর তো নয় যেন একটা বাগান , সে কয় । কানের ব্যায়াম কমাইতে আসছি , এত কথা কিসির ? আমি দেখি , মামুনের বাগান দেখি । এইটা ভুট্রার বাগান অথবা বাঁধাকপি-ফুলকপির বাগান অথবা সরিষার বাগান হইতে পারে অথবা ভুট্টা-বাঁধাকপি-ফুলকপি ও সরিষার সম্মিলিত বাগানও হইতে পারে । সে কয় , বহুত দিন পরে এইরম দেখলাম , সরিষা , গোটা মাঠটা কেমন হলুদ হইয়া আছে , দেখছ । আমি সরিষার মাঠের হলুদ দেখি । সে কয় , দেখছ মিয়া ঐখানে ভুট্টা গাছগুলা দেখছ , মাসখানেকের গাছ হইব বোধহয় , দূর থাইকা কেমন ঘাসের মতন দেখা যায় , দেখছ । আমি দূরের , আরো দূরের চরে অথবা নদীর অববাহিকায় ঘাসের মতন ভুট্টা অথবা ভুট্টার মত ঘাসদের দেখি । সে কয় ,চেন নাকি ,পাশের ক্ষেতের এইগুলারে চেন । আমি কই , চিনি চিনি , ফুলকপি । সে কয় ধুর মিয়া , এইগুলান বাঁধাকপি ,খিয়াল কইরা দেখ । আমি খিয়াল কইরা দেখি ,ফুলকপি অথবা বাঁধাকপির গাছ দেখি । ফুলকপি অথবা বাধকপি , ঘাস অথবা ভুট্টাগাছ , হলুদ সরিষা ক্ষেত দেখতে আমার ভাল লাগে । তারা আমারে চোখের ব্যায়াম কমাইতে দেয়না । অনেকদিন পর চোখের ব্যায়াম কইরা আমার আরাম হয় । চোখের ভাল ব্যায়াম হওয়ার পরে আমার ঠোটের ব্যায়ামের দরকার হইয়া পড়ে। আমি একটা বেনসন ধরাই । মামুন ঠোটের ব্যায়াম করে না । তাই সে মুখের ব্যায়াম শুরু করে । সে আম্রিকা নামের একটা দেশে যাইতে চায় । সে কয় , আমেরিকা গেলে চোখ নষ্ট হইতে পারে , ঐ দেশে চোখের ব্যায়াম বেশি হয় , বাস্তায় নামলে চোখ এদিক সেদিক যায় , উপরে নিচে যাইতে চায় ধইরা রাখা যায় না ,আমরা আমেরিকা গেলে চোখের ব্যায়াম কম কইরা করবনে । আমি কই , হবেনে । সে এতদিনেও বোঝেনি শহরে চোখের ব্যায়াম কইরতে আমার খারাপ লাগে না , আসসোস । সে কয় , অই মিয়া জিআরইটা তুমি দিয়া ফালাও আমি দিচ্ছি জিম্যাটটা , আমেরিকা যাইতেই হইব বুঝলা । আমি সিগারেট খাই , বেনসন না অইন্য কিছু , টেষ্ট বইলতে কিছু নাই , ড্যাম হয়া গেছে মনে হয় , ছুইড়া ফেলি , ঠোটের ব্যায়াম ভাল হয় না । এরপর সে ভাবে , অনেকক্ষন ধইরা কি জানি ভাবে ,এরপর কয় , শালা , চুর্দিভাই দেশ একটা আমেরিকা ,একবার যাই , এরে ভাল মত ব্যায়াম করাইতে হইব।






>>>>>>>বাকিটুকু পড়ুন...

সোমবার, ৩ নভেম্বর, ২০০৮

বোয়াল

আগষ্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমি একবার মাছ ধরতে যাই । এটাকে অবশ্য মাছ ধরা না বলে মাছ দেখাও বলা যেতে পারে । আমার এক বন্ধু একবার বলেছিল জ্যোসনা রাতে করতোয়ার বোয়ালরা তীরের খুব কাছাকাছি চলে আসে । পানিতে তাকালে নাকি বোয়ালের জ্বলজ্বল করা রূপালী চোখ দেখা যায় । রূপালী চোখ নিয়ে বোয়ালরা যখন চারপাশে ঘুরে বেড়ায় তখন যে দৃশ্যের সৃষ্টি হয় তার নাকি কোন তুলনা নাই । তাই বোয়ালের এই চোখ দেখার উদ্দেশ্য নিয়েই আগষ্ট মাসের হাল্কা গরমের এক রাতে করতোয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম ।

নজুপুর হাটের পাশেই এই করতোয়া নদী । হাটসংলগ্ন নদীর তীরটা ক্রমশ ভাঙছে । দোকানীদের হয়েছে অসুবিধা। কিছুদিন পরপরই দোকান সামনে এগিয়ে নিতে হয় , নদী এগিয়ে আসে । করতোয়ার অপর তীরে দীর্ঘ চর । চরের বালিতে আখ , চীনাবাদাম আর আলুর চাষ হয় । চর থেকে ওপারের গ্রাম্য হাটটা দেখতে ভালই লাগে । হাটের রাতে তীরসংলগ্ন দোকানগুলোর হ্যাজাক আর কুপির আলো দোকানের ফাঁকা ফাঁকা করে বসানো কাঠের চিরগুলোর মধ্য দিয়ে নদীতে এসে পড়ে । মনে হয় অজস্র জোনাকী যেন সার বেঁধে নদীর পানিতে এসে লম্বা লাইন দিয়েছে । আজও হাটবার ছিল । দেখতে দেখতে হাটটা ফাঁকা হয়ে গেল সন্ধ্যার পরপরই । গ্রামের হাট,বেশী রাত জাগার অভ্যাস নেই ।। হাট থেকে ফিরে আসা শেষ নৌকার লোকগুলোও চরের মধ্যে কিছুক্ষন বসে বিড়ি-সিগারেট খেয়ে ফিরে গেল । এই বিস্তীর্ণ চরে মানুষ বলতে গেলে এখন বোধহয় শুধু আমি আর রজব সরদার।

রজব সরদারের বয়স প্রায় পয়তাল্লিশের কাছাকাছি । খাটো ,পাতলা টিঙটিঙে একজন লোক । এ বয়সে মাথার চুল কিছু পাকার কথা থাকলেও এনার চুল পাকে নি । রজবের বাড়ী এই করতোয়ার পাশেই কেবলাপুর গ্রামে । ঘরে জোয়ান ছেলেরা আছে । তারাই জমিজমা দেখাশুনা আর ক্ষেতখামারীর যাবতীয় কাজ করে । রজব সরদার মাছ ধরেন । মাছ ধরা তার পেশা নয় নেশা । যদিও রজবের কথাবার্তা শুনলেই বোঝা যায় কাজটা নিতান্তই শখের বশে হলেও বেশ মনযোগ দিয়েই পেশাদারিত্বের সাথে করেন তিনি । রজবের সাথে আমার প্রথম যখন এই অঞ্চলে এসে দেখা হয় তখন সে আমাকে বলেছিল ,
‘ বুঝলেন মাছ ধরাটা হইল গিয়া একটা বদ নিশা , মদ আর মাইয়া মানুষের চাইয়াও খারাপ নিশা , সহজে ছাড়ান যায় না । যৈবনে যে একবার মাছ ধরে বুড়া বয়সে আইসাও তারে মাছ ধরতে হয় ।‘
আমি রজবের কথা শুনে সেসময়ে হেসেছিলাম ।

অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ের রাত । সারাদিনে গরম থাকলেও রাতের বেলা দেখি চরে ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব । উত্তরবঙ্গ, এখানে শীত বেশ তাড়াতাড়িই আসে । রজব আমাকে ফুলহাতা শার্টটার নিচে গেন্জিজাতীয় কিছু একটা পরে নিতে বলেন । আমি বলি ,
‘কোন গেন্জি তো আনি নি’ ।
রাতে এরকম শীত পড়বে কে জানত ? রজব বলেন,
‘ চিন্তা কইরেন না । চালা থেকে গিলাপ(চাদর) দিয়া দিমুনে।‘

এই চরের মধ্যে রজবের চালা আছে জেনে আমি একটু আশ্চর্য হই । আরও আশ্চর্য হই চালার গঠনশৈলী দেখে । চালা ঘর বলতে যে রকম ঘর কল্পনায় চলে আসে সেরকম ঘর এটা নয় । কোন রকমে দুইজন মানুষ থাকার জন্য একটা কুঠুরিমতন জিনিস তৈরী করা হয়েছে আখের পাতা আর বাশের কঞ্চি দিয়ে । কয়েকটি কঞ্চি এক জায়গায় করে খুঁটির মত বানিয়ে উপরে আখের সরু পাতা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে । প্রথম দিন যখন রজবের সাথে এই চরে দেখা হয়েছিল তখন চালাটি চোখে পড়ে নি । আমি রজবকে বলি ,
’ কি এখানে থাকেন নাকি ?’
রজব বলেন ,
’ মাছ ধরন হইল গিয়া ধৈর্য্যের কাম । কতক্ষন আর ধৈর্য্য রাখা যায় । মাঝে মইদ্যে চালায় যাই , খানিকটা জিরায়া আসি। বাড়ী থাইকা আহনের সময় সাথে মশারী নিয়া আহি । মশার যন্ত্রনা আছে । চারপাশে টাঙায়া দেই । ইচ্ছে হইলে তাই ঘুমোনও যায় ।‘
রজব আমাকে চালার মধ্য থেকে চাদর বের করে দেন । চালার মধ্যে রজবের মাছ ধরার সামগ্রী আর কিছু শুকনা খাবারও দেখি । আমার আর তর সয় না , বলি ,
’ চলেন , মাছ ধরার আয়োজন শুরু করি ।‘

যদিও আমার উদ্দেশ্য মাছ ধরা নয় মাছ দেখা তারপরও রজবকে মাছ ধরার কথাই বলতে হয় । এই নিশুতি রাতে কেউ একজন মাছের চোখ দেখার জন্য এই চরে পড়ে আছে এটা শুনলে রজব নিশ্চয় আমাকে পাগল ভাববে । রজব অনিকক্ষন কাশেন । চরের ঠান্ডা হাওয়ায় দিনের পর দিন থেকে হয়ত কাশি লাগিয়ে ফেলেছেন । কাশি থামানোর পর বলেন ,
‘ চ্যাং দিলেও এহন কাম হইব না । মাছেরা মানুষের চাইতে রাত ভাল বোঝে , বেশী রাত না হইলে তীরের কাছে আহে না ।‘
চ্যাং শব্দটা আগে কোনদিন শুনেছি বলে আমি মনে করতে পারি না । রজবের কাছে জানতে চাই এই চ্যাংটা কি ? রজব বলেন ,
‘ চ্যাং হইল গিয়া গড়াই মাছেরই একটা জাত । তয় এরা বেশী অস্থির । বরশীতে গাঁইথা পানিতে ছাইড়া দিলে খালি লাফায় । এদের বোয়াল কামুড় দিলেই বোয়াল শ্যাষ , বরশী ঢুইকা যায় বোয়ালের মুখের মইদ্যে ।‘
রজব চালাঘর থেকে চটের একটা বস্তা এনে চরের হাল্কা ভেজা বালিতে পেড়ে দেন । আমি বসি । রজব হুকায় টান দিতে থাকেন । এই দিনেও লোকজন হুকা খায় এটা আমার জানা ছিল না । আমি তন্ময় হয়ে রজবের হুকা খাওয়া দেখি । রজব গল্প জুড়ে দেন , নিতান্ত পারিবারিক গল্প ।

রাত গভীর হয়ে গেল রজব পলিথিনের একটা প্যাকেট থেকে চ্যাং বের করা শুরু করেন । প্যাকেটের পানিতে দেখি এরা ভালভাবেই বেঁচে আছে । রজবের কথাই ঠিক , এই মাছ অতিশয় অস্থির । হাতে নেয়ার সাথে সাথে মাথা ও লেজ একসাথে প্রবলবেগে নাড়াতে শুরু করে । রজব একটা একটা করে চ্যাং বরশীতে গাঁথেন । শরীরের মাঝামাঝি বরশী গাঁথার ফলে চ্যাং আরও বেশী করে লাফাতে শুরু করে । বরশীর সূতাটার আরেক মাথা বাঁধা হয় শক্ত বাশের কঞ্চির সাথে , নদীর পাড়গুলোতে এগুলো নাকি পোতা হবে । আমি আর রজব দুজনে মিলে সবগুলো কঞ্চিগুলো কিছুদূর ফাঁক ফাঁক করে করে তীরে গেড়ে আসি ।

আমরা চালার সামনে এসে বসে পড়ি । রজব আবার বলতে শুরু করেন ,
‘ বুঝলেন তো মাছ ধরা হইল গিয়া ধৈর্য্যের কাম....... ।‘
হ্যাঁ , মাছ ধরা যে আসলেই চরম ধৈর্য্যের একটা কাজ সেই রাতে সেটা বুঝতে পারলাম হাড়ে হাড়ে । অনেকক্ষন আগে চ্যাংসমেত বরশী দেয়া হলেও সেগুলোতে কোন মাছ পড়ে না । আমি মাঝে মাঝে পানির কাছাকাছি গিয়ে টর্চ মেরে দেখি , বোয়ালের চোখ খুঁজি । রজব হয়ত মনে করেন মাছ পড়ছে না দেখে আমি অস্থির হয়ে পড়েছি । আমাকে বলেন ,
‘ ঘুরনের কাম নাই আপনের , এইহানে আইসা বসেন । বোয়াল পড়লে এমনিতে বুঝবেন , পানির মইদ্যে চ্যাংয়ের ছঠফটানি যাইব বাইড়া । বোয়াল আইসা চ্যাংরে একেকটা কামড়াইব আর চ্যাংও এদিক-ওদিক লাফাইব ।‘
হ্যাঁ , চ্যাংকে ঘায়েল করতে বোয়ালের বোধহয় ভালই সময় লাগে কারন পানিতে একসময় বেশ হুটোপুটির শব্দ শোনা যায় । নিস্তব্ধ করতোয়ার পাড়ে শব্দটা ঠিক যেন বর্শার ফলার মতই বেঁধে কানে । রজব বলেন ,
‘ চলেন একটা বুঝি পড়ল ।‘ আমি আর রজব তড়িঘড়ি করে যাই শব্দটার উৎসের কাছে ।

গিয়ে দেখি কঞ্চিটা ঠিকই চরের বালিতে গাড়া আছে , বরশীও ঠিক আছে কিন্তু বরশীতে গাঁথা মাছটা আর নেই । আমি রজবকে আমার বামে একটু দূরে পানিতে রূপালী রংয়ের একটা চোখ দেখাই ।
রজব বলেন , ‘ ওঠেন , তাড়াতাড়ি টর্চটা ফেলেন ঐদিকে ।‘
আমি আমার সাথে থাকা এক ব্যাটারীর টর্চের আলো নদীর পানিতে ফেলি । পানির মধ্যে রূপালী চোখ নিয়ে একটা বোয়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে ।
রজব অনেকক্ষন কেশে নেন তারপর বলেন , ‘এই বোয়ালটা অনেক বড় , গতবার পাইছিলাম এইরকম একটা। সচরাচর এইরকম বড় বোয়াল পাওয়া যায় না ।‘
আমি বলি ,’ কোথায় আমার কাছে তো খুব একটা বড় মনে হল না ।‘
রজব বলেন,’ আপনারা সাহেব-সুবা শহরের মানুষ , পানির উপরে থাইকা কি আর বোয়ালরে বুঝতে পারবেন।‘ এতবড় একটা বোয়াল হাতছাড়া হওয়ায় রজবের মন একটু খারাপই হওয়ার কথা কিন্তু তাকে দেখে সেরকম মনে হল না ।
তিনি বলে চললেন ,‘বুঝলেন যত বড় মাছ তত চালাক । চালাক না হইলে কি আর পানির এত শত্রুর মইদ্যে বাইড়া ওঠন সম্ভব । দেখলেন না চ্যাংটারে কেমনে খাইয়া গেছে । বরশী তো আমরা দিছিলাম চ্যাংয়ের পেটের মইদ্যে । এইটা কামুড় দিছে ল্যাজে । যাই হোক একবার যহন খাইছে তখন এইটা এহানেই থাকব । আসেন আমরা আরেকটা চ্যাং দেই ।‘
রজব আগের মতই পলিথিনের প্যাকেটটা থেকে আরেকটা চ্যাং এনে বরশীতে গেঁথে দেন । আমরা চালার সামনে গিয়ে আবার বসে পড়ি ।

খানিকক্ষণ পর আবার হুটোপুটির শব্দ শুরু হয় পানিতে । আগের জায়গাটা থেকেই শব্দটা আসছে । আমরা আবার প্রবল আগ্রহ নিয়ে কঞ্চিটার কাছে যাই ও হতাশ হই । চ্যাংটা নেই । হয়ত আগের বোয়ালটাই মাছটা খেয়ে গেছে অথবা নতুন কোন বোয়াল এসেছিল ।
রজব আমাকে বলেন , ‘ বুঝলেন আগের বোয়ালটাই চ্যাং টা খাইয়া গ্যাছে । এত জলদি জলদি আরেকটা পড়নের কথা না ।‘
রজব আরেকটা মাছ বরশীতে গেঁথে দেন এবং আগের মতই আমরা আবার চালার সামনে এসে বসি । আবার কিছুক্ষণ পর বরশীতে বোয়াল পাওয়ার শব্দ পাই কিন্তু কোন বোয়াল আর পাওয়া যায় না । রজবের এই একটা বরশীতেই আরো দুটা চ্যাং নষ্ট হয় , একটাতেও পড়ে না বোয়াল । রজব বিড়বিড় করে কি যেন বলেন । হয়ত মেজাজ খারাপ হয়েছে তার । আমার বেশ মজাই লাগে । আগেই বলেছি মাছ ধরার কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এই রাতে করোতোয়ার পাড়ে আমি আসি নি এসেছি জ্যোসনা রাতে বোয়ালের রূপালী চোখ দেখতে । সে আশা আমার প্রথমবারেই পূর্ণ হয়েছে । সে এক দৃশ্য বটে ! বন্ধুটা আমার ঠিকই বলেছিল । গোটা দুনিয়ায় এরকম সুন্দর দৃশ্য খুব একটা নেই ।

রজব বলেন ,’ বুঝলেন তো এইভাবে হইব না , পঁচা লাগব ।‘
রজব লোকটার এই এক মুদ্রাদোষ কথায় কথায় বলেন বুঝলেন । পঁচা জিনিসটা কি আমার মাথায় ঢোকে না । আমি বলি ,’ পঁচা কি’ ?
রজব বলেন , ‘ পঁচাই হইল আসল ধৈর্য্যের খেলা । আসেন আপনেরে দেখাই ।‘
রজব চালাঘর থেকে আরেকটা প্লাষ্টিকের প্যাকেট খোলেন । প্যাকেটের ভিতরে বেশ কটু গন্ধযুক্ত রোদে শুকানো পুঁটি মাছ । মাছগুলোর ভিতরের পুরো কাঁটাই বেশ দক্ষতার সাথে তুলে ফেলা হয়েছে । রজব একটা মাছ নিয়ে কাঁটার ফাঁকা জায়গাটায় একটা বরশী বিঁধে দেন । যে জায়গাটায় বোয়ালটা বারবার চ্যাং মাছগুলো খেয়ে যাচ্ছিল তার পাশেই নদীর পানিতে সামান্য দূরে বরশীটা ছুড়ে দিয়ে চরের মাটিতে বসে পড়েন ।
আমাকে বলেন , ‘ বসেন । এইবার হইল গিয়া আসল খেলা । পঁচাটা দিলাম পানির মইদ্যে , এহন বইসা থাকনের পালা । ফকফকা জোসনারা রাইত , খালি বইসা থাকবেন আর খিয়াল করবেন বরশীটার দিকে । পঁচার পুঁটিটা যখন বোয়ালে খাইব তখন বরশীর সূতাটা সইরা যাইতে থাকব একদিকে । বাস , যেইদিকে সূতাটা সইরা যাইব তার উল্টাদিকে দিবেন জোরসে একটা টান । বোয়ালের গলায় আটকাইয়া যাইব কাঁটাটা ।‘

রজবের কথায় আমি আশ্চর্য না হয়ে পারি না । এত মনযোগ দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কিভাবে পঁচার দিকে তাকিয়ে থাকা সম্ভব?
রজব আবার বলেন , ‘ এইজন্যি তো আপনেরে বারেবারে কই বড়ই ধৈর্য্যের কাম এইটা । এইযে বসছেন একবার পঁচা দিয়া , সারারাত বইসা থাকলেও যে মাছের নাগাল পাবেন তার কি কোন ঠিক আছে ?’

রজব বসে থাকেন । বসে থাকতে থাকতে পা লেগে গেলে একসময় আমাকে পঁচাটা দেন ।
‘ ধরেন , এট্টু তামুক খাইয়া আহি ।‘
আমি পঁচাটা ধরে বসে থাকি আর মাছের চোখ দেখার জন্য এদিক-ওদিক তাকাই । কিছুক্ষণ পরেই রজব আবার ফিরে এসে আবার পঁচাটা ধরেন । আমি নদীর ধারে এদিক-ওদিক হাটি , সিগারেট খাই , চালাঘরে শুয়ে থাকি । মাছ আর পঁচায় পড়ে না । দু-একবার রজবের কাছে যাই এখানেও নাকি বোয়াল টোপ খেয়ে যাচ্ছে ।
রজব বলেন , ‘ বুঝলেন বড়ই কাউটা মাছরে ভাই এইটা , ক্যামনে ক্যামনে জানি পঁচা খাইয়া যাইতাছে ।‘
আমি বলি,’ কিভাবে বুঝলেন এটা আগের বোয়ালটাই , অন্য বোয়ালও তো হতে পারে ।‘
রজব খানিকটা ক্ষেপে যান ।
‘ বিশ বছর ধইরা মাছ ধরতেছি । মাছেরে ভালই চিনি । তয় এরে ছাড়তেছি না আজকে । আপনে যান চালায় শুইয়া পড়েন ।‘

আমি চালাঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ি । মশারীর ফাঁক দিয়ে চরের হাল্কা ঠান্ডা বাতাস ভেঙে ভেঙে ঘরটার মধ্যে ঢুকে পড়ছে। ঘুমানোর জন্য আদর্শ আবহাওয়া । ঘুমানোর ইচ্ছা না থাকলেও তাই একসময় ঘুমিয়েই পড়ি ।

ঘুম ভাঙে প্রায় শেষ রাতের দিকে , রজবের গজগজানিতে ।
‘ বুঝলেন এতদিন ধইরা মাছ ধরি এইরকম চালাক মাছ আর দেখিনি । চ্যাং-পঁচা কিছুই মানতেছে না । চলেন এইবার শেষ চেষ্টাটা করি , কাটাটা মারি ।‘
চালাঘরে আমি যেখানে শুয়েছিলাম তার নিচ থেকে পাতলা লোহার তৈরী শাবল জাতীয় একটা জিনিস বের করেন রজব । জিনিসটার মাথায় শাবলের মতই তীক্ষ্ণ ফলা । এটাই নাকি কাটা । রজব পলিথিনের ব্যাগ থেকে শেষ চ্যাংটা বের করেন । আগের মতই চ্যাং টা বরশীতে গেঁথে বরশীর সূতা কঞ্চিতে বেঁধে আগের জায়গাটাতেই পুতে ফেলেন ।
রজব বলেন , ‘ বুঝলেন শ্যাষবারের খেলা এইবার । বোয়ালের চ্যাং টারে ধরার আওয়াজ পাইলেই টর্চ মারবেন ঐ জায়গায় । এরপরে আমি আছি ।‘

আমরা আবার চরের মাটিতে বসে জলের শব্দ শুনতে থাকি । অনেকক্ষণ বসে থাকার পরও যখন কোন বোয়াল আসে না তখন আমার মেজাজ সত্যিই খারাপ হতে থাকে , মাছ ধরাতো আমার কাজ নয় !
আমি রজবকে বলি,’ চলেন আজকে আর মনে হয় হবে না । ঐ বোয়ালটাই যে আসবে তার কি গ্যারান্টি ?’
রজব আমার কথার কোন জবাব দেন না । মনে হয় বিরক্ত হয়েছেন আমার ওপর । তবে মাছটার উপর তার ক্ষোভ কোন পর্যায়ে এসে পড়েছে তা বুঝতে পারি । আমি এবার রজবের সামনেই একটা সিগারেট ধরিয়ে বসে পড়ি । রজব বলেন ,’ সারারাইত তো থাকলেনই , এই শ্যাষবার একটু দেহেন ।‘

রজবের কথা মিথ্যা হয় নি । ফজরের আজানের ঠিক একটু আগে পানিতে চ্যাংয়ের লাফালাফি প্রবল হয়ে ওঠে । বোয়ালের রূপালী চোখটা আবার আমি দেখতে পাই । রজব মুখে আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে বলেন আর ইশারায় আলো ফেলতে বলেন । আমি পানিতে মাছটার উপর আলো ফেলি । আলো ফেলামাত্র রজব কাটাটা নিয়ে বিদুৎবেগে মাছটার শরীরে বিদ্ধ করার জন্য পানিতে লাফ দেন । বয়স্ক একজন লোক কিভাবে এত তাড়াতাড়ি কাটাটা সমেত পানিতে লাফিয়ে পড়ে কাটাটা মাছের গায়ে বিদ্ধ করার চেষ্টা করেন তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন । হয়ত টর্চের আলোয় মাছ দূরে সরে যেতে চায় । এত তাড়াতাড়ি না করলে চলবে কিভাবে ? রজবের শেষ চেষ্টাটা বিফলে যায় নি । বেশ বড় সাইজের কাটাবিদ্ধ একটা বোয়াল নিয়ে রজব উঠে আসেন পানি থেকে । কাটাটা দেখি বোয়ালের শরীরের ঠিক মাছখানে বিঁধেছে । থেতলে গেছে বেশ খানিকটা অংশ । রজবের মুখে বিজয়ীর হাসি ।
‘ কইছিলাম না আগের বোয়ালটাই , দেখছেন কত্ত বড় । আগের বছরে যেইটা পাইছিলাম তার চাইতে এটা বড় । বুঝলেন এইজন্যি কাটা দিয়া মাছ ধরি না , মাছের শইল বলতে কিছু থাকে না ।‘
আমি মাছটার দিকে তাকিয়ে থাকি । জলের মধ্যে জীবন্ত মাছের চোখ আর জলের বাহিরে মৃত মাছের চোখের মধ্যে কত পার্থক্য ।
রজব বলেন,’ আপনেরে কিন্তু আজকে আর সহজে ছাড়তেছি না । সকালে বাড়িত থাইকা মাছের পেটি দিয়া ভাত খাইয়া যাবেন ।‘

আমি কিছু বলি না । এরকম লড়াকু , পরাজিত আর অবশেষে মৃত বোয়ালটা দেখতে আমার কেন জানি ভাল লাগে না ।

>>>>>>>বাকিটুকু পড়ুন...